নিষিদ্ধের ২৩ বছর পরও সদর্পে পলিথিন

  • আপডেট সময় বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৬ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ২৯ অক্টোবর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।

বিগত বিএনপি সরকার ক্ষমতাকালে ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি দেশে আইন করে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু ২৩ বছর পর আজও বহাল তবিয়তে বাজারে টিকে রয়েছে পলিথিন ব্যাগ। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিএনপি, সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক আর আওয়ামী লীগের তিনটি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, কিন্তু এর উৎপাদন ও বিক্রি তারা ঠেকাতে পারেনি। সেই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারও এখন পর্যন্ত ব্যর্থই বলা যায়। পরিবেশ রক্ষায় জোর দিয়ে প্রায় এক বছর আগে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধে তোড়জোড় শুরু করে। বছর ঘুরলেও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।

—————————————————————————————————————–

পলিথিন ব্যাগের ক্ষতিকর দিক নিয়ে লেখালেখি, সভা-সেমিনার কম হয়নি, কিন্তু মানুষ বাজার করার ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যাগ ব্যবহারে তেমন উৎসাহ দেখাচ্ছে না। পাটের ব্যাগের দাম তুলনামূলক বেশি এবং বহনের জটিলতার কারণেই মানুষ মূলত এটি ব্যবহারের আগ্রহ পাচ্ছেন না। ফলে পলিথিনের বিকল্পের জায়গায় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

শুধু সুপারশপগুলোতে এই ব্যাগের ব্যবহার বন্ধ করা গেছে, কারণ দোকানগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সহজ বা উদ্যোক্তারা আইন মেনে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে তুলনামূলক সচেতন।

——————————————————————————————————————

২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালালেও সেটি কার্যকর হয়নি। অভিযোগ আছে, পলিথিনের উৎপাদকরা সরকারি চাকরিজীবীদের মাসোহারা দিয়ে থাকে ; এই ভাগ ক্ষমতাসীন দলগুলোর নেতাকর্মীরাও পেয়ে আসছে।

২৩ বছরে বহুবার পাটের পরিবেশবান্ধব পলিথিন ব্যাগ বাজারে আনার কথা হয়েছে। একজন উদ্ভাবক পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন করে সরকারি সংস্থার কাছে হস্তান্তরও করেছিলেন। মন্ত্রীরা নানা সময় সেই ব্যাগ নিয়ে ফটোসেশনও করেছেন, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে সেই ব্যাগ আর আসেনি।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে আসার পর পরিবেশের সুরক্ষায় ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর থেকে সুপারশপে এবং ১ নভেম্বর থেকে কাঁচাবাজারে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বক্তব্যের অর্থ করলে দাঁড়ায়, আগে যা হয়েছে হয়েছে, এবার পলিথিন নিষিদ্ধ হবেই। তবে দেশের সব বাজারে আগের মতোই পলিথিনে ভরে ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে।

—————————————————————————————————–

নোয়াখালীর সোনাপুর বাজারের সবজি বিক্রেতা নাজমুল বলেন, কাস্টমারই পলিথিন খোঁজে। একটা দিলে আবার আরেকটা চায়। কার্যকর বিকল্প যে নেই, সেটি এই বিক্রেতার কথাতেই ওঠে এলো। তিনি বলেন, পলিথিন না দিয়া উপায় আছেনি ? এরা অফিস-আদালত শেষ করে বাজারে আসে। সঙ্গে কি ব্যাগ নিয়ে ঘুরে ? ওই বাজারের মুরগি কিনছিলেন নাসির শাহ। বলেন, মুরগি বাসায় নিতে পলিথিন ছাড়া আর কী আছে বলুন তো ? মাছ-মাংস নিতে পলিথিন লাগবেই। না হয় গন্ধ ছড়াবে, পানি ও রক্ত ঝরবে।

——————————————————————————————————

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণার পর পলিথিন অনেকটা গোপনে বিক্রি হচ্ছে এবং দাম বেড়েছে। সোনাপুর বাজারে ইসুবগুল, তোকমা বিক্রেতা অহিদ মিয়া বলেন, মানুষ পলিথিন ছাড়া নিবে ? আমার কাছে কিন্তু কাগজের ঠোঙাও আছে। কিন্তু মানুষ তো নিবে না। ছিদ্র হলে অথবা ভিজে গেলে জিনিস পড়ে যাবে, নষ্ট হবে।

সচেতন মানুষের দেখাও মেলে

বাজারে কোনো কোনো ক্রেতাকে বাসা থেকে বড় ব্যাগ আনতে দেখা গেছে। তাদের কেউ কেউ শুকনো পণ্য পলিথিনে না নিয়ে সরাসরি ব্যাগেই নিচ্ছেন। মাইজদী পৌর বাজারে আসা জাবেদ বলেন, পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে প্লাস্টিক জাতীয় জিনিস। তাই যত কম প্লাস্টিক ইউজ করা যায় ততই মঙ্গল।

বিকল্প ব্যাগের উচ্চমূল্য

পৌর বাজারের সবজি বিক্রেতা আহসান বলেন, কেজিতে আগের চেয়ে দাম বাড়াইছে। আহসানকে পলিথিন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার কথা বললে তিনি বলেন, পলিথিনে না দিলে দিমু কিসে ? সরকার যেসবের কথা বলে সেসবের দাম বেশি।

এই বাজারের মাছ বিক্রেতা আকবর হোসেনও একই কথা জানালেন। তিনি বললেন, একবার টিস্যু ব্যাগ বাইর করছিল। কিন্তু সেটার যে দাম, পোষায় না। একেকটা চার-পাঁচ টাকা। মামলা খাইলে খামু, তবুও এত দাম দিয়া কিনতে রাজি না। মাছ বেচে যা লাভ করমু, ব্যাগ কিনা তা খরচ করলে ব্যবসা টঙ্গে ওঠবে।

পরিবর্তন সুপারশপে

কাঁচাবাজারগুলোতে পরিবর্তন না থাকলেও সুপারশপগুলোতে পলিথিন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার পর পরিবর্তন চোখে পড়েছে। পলিথিনের বদলে এখন সেখানে কাগজের ঠোঙায় পণ্য দেয়া হচ্ছে ; বিক্রি হচ্ছে কাপড় বা পাটের ব্যাগ। ক্রেতারা বাধ্য হয়ে সেসব ব্যাগ কিনছেন, আবার অনেককে বাসা থেকে ব্যাগ আনতেও দেখা গেছে।

মাইজদী এলাকার একটি সুপারশপের ইনচার্জ বলেন, গত বছরের অক্টোবর থেকেই মূলত আমরা পলিথিনের বিকল্প চিন্তা করি। ক্রেতাদের ব্যাগ আনতে উৎসাহিত করি, পাশাপাশি ক্রেতারা চাইলে আমাদের কাছ থেকে পাটের ব্যাগ কিনতে পারবে সেই সুযোগও আছে।

স্বপ্ন সুপারশপে জালি ব্যাগ, কাগজের ঠোঙা, সুতির ব্যাগ ও পাটের ব্যাগ রয়েছে। এর মধ্যে কাগজের ঠোঙা ও জালি ব্যাগ ক্রেতাদের ফ্রিতে দেয়া হয়। আর সুতির ব্যাগ ৮ থেকে ১০ টাকা ও পাটের ব্যাগ ১৮ থেকে ২০ টাকায় কিনতে পারছেন ক্রেতারা।

নিস্ফল অভিযান

সারাদেশেই পলিথিনবিরোধী অভিযান পরিচালনা করছে পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। তবুও কিছুতেই থামছেনা উৎপাদন, বিক্রয়, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ। তবে এমন অভিযান প্রায় দুই যুগ ধরেই চলছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) একজন মিজানুর রহমান বলেন, আসলে খুচরা ব্যবসায়ী, ব্যবহারকারী বা পলিথিন বিক্রেতাদের ধরে পলিথিন ব্যবহার বন্ধ সম্ভব নয়। পলিথিন তৈরিতে যেসব জিনিস আমদানি করা হয়, সেখানে বড় সিন্ডিকেট আছে। তাদের শনাক্ত করে আমদানি বন্ধ করতে হবে।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!