দুদকের আসামীকেই দেয়া হয়েছে পুলিশের পোশাক কেনাকাটার কাজ

  • আপডেট সময় রবিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।

বাংলাদেশ পুলিশের নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহের ১৪১ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়েছে নোমান গ্রুপকে। এ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা।

বাংলাদেশ পুলিশের নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহের ১৪১ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়েছে নোমান গ্রুপকে। এ গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা। অন্যদিকে বুট ও বিভিন্ন ধরনের জুতা সরবরাহের কাজ পেয়েছে ফ্রেন্ডস ট্রেডিং করপোরেশন।

অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির নেই নিজস্ব ট্যানারি, জুতা তৈরির কারখানা ও পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের বরিশাল বিএম কলেজ শাখার সাবেক আহ্বায়ক ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মহানগর সদস্য গাজী তৌকির রহমান শুভ। চেক ডিজঅনারের মামলাও হয়েছিল তার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ পুলিশের জন্য বুট, ট্রেনিং ও প্যারেড বুট, ক্যানভাস সু সরবরাহে ১০৫ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে গাজী তৌকির রহমানের প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার ঘটনাকে অস্বচ্ছ, অগ্রহণযোগ্য ও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অবশ্য পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সব কেনাকাটা সম্পন্ন হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, পুলিশের নতুন পোশাকের জন্য বিভিন্ন ধরনের কাপড় সরবরাহ করছে নোমান গ্রুপ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) সবার আগে নতুন পোশাক দেয়া হয়েছে ট্রাফিক বিভাগের সদস্যদের। তেজগাঁও এলাকায় দায়িত্বরত এক ট্রাফিক সদস্যের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, নতুন পোশাকের কাপড় আগের কাপড়ের চেয়ে শক্ত। দীর্ঘ সময় এ পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হবে। তাছাড়া শীত হওয়ায় এখন এ কাপড় পরা যাচ্ছে, কিন্তু গরমকালে রাস্তায় থাকা কষ্টকর হতে পারে।

নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বলেন, এ বছরে পুলিশের জন্য ১২ লাখ মিটার কাপড় সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। এরই মধ্যে তিন-চার লাখ মিটার সরবরাহ করা হয়েছে। পুলিশ সদস্যরা দীর্ঘ সময় রোদে দাঁড়িয়ে ডিউটি করেন। এজন্য তাদের কাপড়ে বিশেষ ধরনের হারকোমা জার্মান রঙ ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য রঙ থেকে এটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এছাড়া পুলিশের কাপড় ২৪০ জিএসএমের দেয়া হয়েছে। এ ধরনের কাপড় আরামদায়ক।

ঘোষিত আয়ের বাইরে প্রায় ১৯ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর আগে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মো. নুরুল ইসলামের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।

দুদক বলছে, সব মিলিয়ে মো. নুরুল ইসলামের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ১৮ কোটি ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এসব সম্পদ অসাধু উপায়ে অর্জন করে নিজ ভোগদখলে রেখে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এছাড়া ওই অবৈধ সম্পদ অর্জনে অন্যদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা, তা তদন্তে উদ্ঘাটিত হতে পারে।

যদিও সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০০৮-এর মূল লক্ষ্য হলো সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সব অংশগ্রহণকারীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। এ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, যদি কোনো দরদাতা (টেন্ডারার) অযোগ্য বিবেচিত হন বা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে, তবে তাকে সরকারি কেনাকাটা প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বাদ দেয়া হতে পারে। সুতরাং দুদকে মামলা চলমান থাকা বা কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়টি সরকারি কেনাকাটায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো দরদাতার জন্য বড় একটি বাধা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে গ্রুপের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা এবং তদন্ত চলমান থাকার পরও পুলিশের কাপড় সরবরাহের কাজ দেয়া হয়েছে নোমান গ্রুপকে। ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী, আর্থিক অনিয়মে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলাম বলেন, দুদক একটা মামলা করেছে। সেটার তদন্ত চলছে। যেহেতু প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই। সেক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে কোনো বাধা নেই।

বাংলাদেশ পুলিশের জন্য বিভিন্ন ধরনের বুট, জুতা ও তোয়ালে সরবরাহ করছে ফ্রেন্ডস ট্রেডিং করপোরেশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ফ্রেন্ডস ট্রেডিং করপোরেশনকে বুট, ট্রেনিং ও প্যারেড বুট, ক্যানভাস সু, মহিলা পুলিশের পাম্প সু, অফিসারদের ক্যানভাস সু, তোয়ালে সরবরাহের জন্য ১০৫ কোটি ২৬ লাখ ৮৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্রেন্ডস ট্রেডিং করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী গাজী তৌকির রহমানের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২৭ আগস্ট ৫৫ লাখ টাকার চেক প্রতারণার মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক পলি আফরোজ এ নির্দেশ দেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আহাদ আলী খান জানান, মামলার বাদী কাজী আতিকুর রহমানের কাছ থেকে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ২০১৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে একই বছরের ২০ জুলাই পর্যন্ত গাজী তৌকির তার ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৫৫ লাখ টাকা নেন।

পরবর্তী সময়ে টাকা ফেরত চাইলে তৌকির টালবাহানা শুরু করেন এবং ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর মার্কেন্টাইল ব্যাংক সাভারের হেমায়েতপুর শাখার হিসাব নম্বরের অনুকূলে আতিকের মেসার্স সুরাইয়া কনস্ট্রাকশনের নামে ৫৫ লাখ টাকার একটি চেক দেন। ১৪ অক্টোবর ব্যাংকে চেকটি জমা দেয়া হলে তা ডিজঅনার হয়।

চেক ডিজঅনার, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ সম্পৃক্ততা ও জুতা তৈরির অভিজ্ঞতা বিষয়ে মতামত জানতে বেশ কয়েক দফা সেলফোনে চেষ্টা করেও গাজী তৌকিরের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

খবর : অন্য দৈনিক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক খাতের মামলাগুলো মূলত প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। এ ধরনের মামলা সাধারণ ফৌজদারি মামলার মতো নয় যে প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে আসামি করা হয়। আর্থিক খাতে পেপার ওয়ার্কের মাধ্যমে অপরাধসংশ্লিষ্টতা পেলেই কেবল মামলা দায়ের হয়। এ ধরনের মামলায় অভিযুক্তের সাজা হওয়ার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ থাকে। ফলে এমন ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি কেনাকাটার কাজ করা উচিত নয়।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের তদন্তাধীন ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে পুলিশ কর্তৃপক্ষ যদি জেনেবুঝে কার্যাদেশ দিয়ে থাকে তাহলে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এটি বাস্তবে দুর্নীতিসহায়ক সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে যারা জড়িত তাদের দুর্নীতিতে অংশীদারত্বের সম্ভাবনা থাকতে পারে। আর যদি না জেনে এ সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তাহলেও এটি অগ্রহণযোগ্য। কারণ সেক্ষেত্রে ক্রয়প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা, এমনকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যোগসাজশের সম্ভাবনা থাকতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টি যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে এমন প্রশ্নবিদ্ধ ও সম্ভাব্য দুর্নীতিসহায়ক সিদ্ধান্তের জন্য যারা দায়ী তাদের দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে এবং তদন্ত সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কার্যাদেশ স্থগিত রাখা উচিত।

উল্লেখ্য, নোমান গ্রুপ থেকে মেট্রোপলিটন ও বিশেষায়িত পুলিশ সদস্যদের জন্য সাত লাখ মিটার আয়রন টিসি প্লেইন ফ্যাব্রিকস কিনতে খরচ হয়েছে ৩০ কোটি ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ টাকা। ১ লাখ ৭৫ হাজার মিটার টিসি টুইল কমব্যাট ফ্যাব্রিক কিনতে পুলিশের খরচ হয়েছে ৮ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ টাকা। জেলা পুলিশের জন্য ১০ লাখ ২০ হাজার মিটার কফি টিসি টুইল কাপড়ের দাম পড়েছে ৩৯ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা।

পাশাপাশি মেট্রোপলিটন ও বিশেষায়িত পুলিশ সদস্যদের জন্য পাঁচ লাখ মিটার কফি টিসি টুইল ফ্যাব্রিক কেনা হয়েছে ১৯ কোটি ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকায়। এর বাইরে মেট্রোপলিটন ও বিশেষায়িত পুলিশ সদস্যদের জন্য ডাবল পিলো কাভারসহ ১ লাখ ৫০ হাজার পিস বিছানার চাদর কেনা হয়েছে ২৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার ৮৫০ টাকায়। প্রশিক্ষণার্থী পুলিশ সদস্যদের জন্য ৬০ হাজার মিটার সাদা শার্টের কাপড় কিনতে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার ৯৪০ টাকা। পিলো কাভারসহ এক লাখ পিস সিঙ্গেল বেডশিট কেনা হয়েছে ১১ কোটি ৯৭ লাখ ৯৯ হাজার ৯০০ টাকায়।

অন্যদিকে ফ্রেন্ডস ট্রেডিং করপোরেশন থেকে ৪০ হাজার জোড়া প্রশিক্ষণ ও প্যারেড বুট কেনা হয়েছে ৯ কোটি ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকায়। দুই লাখ পিস তোয়ালে কেনা হয়েছে ৮ কোটি ৯৪ লাখ ২০০ টাকায়। বুট কেনা হয়েছে দুই লাখ পিস, দাম পড়েছে ৪৯ কোটি ৯৪ লাখ ২০০ টাকা। ১ লাখ ৮০ হাজার ক্যানভাস সু কেনা হয়েছে ৩৫ কোটি ৫৮ লাখ ৬০ হাজার ২০০ টাকায়। এছাড়া নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য ১৭ হাজার জোড়া পাম্প সু কেনায় খরচ হয়েছে ১ কোটি ৬৯ লাখ ৪৯ হাজার ২০ টাকা।

পোশাকের কাপড় ও জুতা ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সব নিয়ম মেনেই পুলিশের কেনাকাটা সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সব কেনাকাটা সম্পন্ন করা হয়েছে। এখানে অস্বচ্ছতার কোনো সুযোগ নেই।

পুলিশের পোশাকের কাপড় ও জুতা কেনাকাটার স্বচ্ছতার বিষয়ে জানতে পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. বাহারুল আলমের সেলফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (লজিস্টিকস ও অ্যাসেট অ্যাকুইজিশন) মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!