পাপ থেকে বাঁচাতে নবীজির অনন্য কৌশল

  • আপডেট সময় বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
  • ১ পাঠক

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ।। ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

পৃথিবীটা এক অনন্ত পরীক্ষার ময়দান। এখানে প্রত্যেক মানুষকে ক্রমাগত লড়াই করতে হয় নিজের প্রবৃত্তি, শয়তানের প্ররোচনা এবং পরিবেশের প্রলোভনের সঙ্গে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৎ ও অসৎ, হালাল ও হারামের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা দিয়েছেন। এই জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় মানুষ ভুল করে, সীমা অতিক্রম করে, পাপে লিপ্ত হয়।

তাই ইসলাম মানুষকে সর্বপ্রথম যে আহবান করে, তা হলো পাপ থেকে বেঁচে থাকা এবং নেক আমলের পথে স্থির থাকা।

পাপ মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। এটি ধীরে ধীরে অন্তরকে কলুষিত করে, আত্মাকে অন্ধ করে, মানুষকে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কিন্তু আল্লাহর রহমত অপরিসীম।

তিনি চান তাঁর বান্দা যেন ফিরে আসে, পরিশুদ্ধ হয়।

মহানবী (সা.) যুবসমাজসহ সবার অন্তরে সার্বিক পরিস্থিতিতে সৎ চেতনা জাগানোর চেষ্টা করতেন। কঠোরতা না করে কখনো যুক্তির নিরিখে, আবার কখনো বাস্তব উপলব্ধির মাধ্যমে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। আবু উমামা বাহিলি (রা.) বলেন, একজন আনসারি যুবক নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ‘ হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন। ’

লোকেরা তার সামনে এসে তাকে তিরস্কার করে বলল, ‘ তুমি চুপ করো, তুমি চুপ করো। ’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ তুমি আমার কাছে এসো।’ যুবকটি নবীজির কাছে এসে বসল। নবীজি (সা.) তাকে বলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য তা (তোমার মায়ের সঙ্গে কেউ ব্যভিচার করবে, এটা) পছন্দ করো ? ’ সে বলল, ‘না, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘ লোকেরাও তাদের মায়ের জন্য এটা অপছন্দ করে।

’ রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে আবার বললেন, ‘ তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য এটা পছন্দ করো ? ’ সে বলল, ‘না, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন। ’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘ লোকেরাও তাদের মেয়েদের জন্য তা অপছন্দ করে। ’ নবীজি (সা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তুমি কি তোমার বোনের জন্য তা পছন্দ করো ?’ সে বলল, ‘না, আল্লাহর শপথ। আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন। ’

নবীজি (সা.) বললেন, ‘ লোকেরাও তাদের বোনদের জন্য তা অপছন্দ করে। ’ রাসুলুল্লাহ (সা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ তুমি কি তোমার ফুফুর জন্য তা পছন্দ করো ? ’ সে বলল, ‘না, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন। ’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘ লোকেরাও তাদের ফুফুদের জন্য তা অপছন্দ করে। ’ নবীজি (সা.) সর্বশেষ প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তোমার খালার জন্য তা পছন্দ করো ? ’ সে বলল, ‘না, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গিত করুন। ’ মহানবী (সা.) বললেন, ‘ লোকেরাও তাদের খালাদের জন্য তা অপছন্দ করে। ’

আবু উমামা বাহিলি (রা.) বলেন, এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের হাত তার শরীরের ওপর রেখে বললেন, ‘ হে আল্লাহ! আপনি তার গুনাহ ক্ষমা করুন, তার অন্তরকে পবিত্র করুন এবং তার লজ্জাস্থানকে হেফাজত করুন। ’ অতঃপর যুবকটি (নবীজির এ দোয়ার বরকত ও বুদ্ধিবৃত্তিক নসিহতের কারণে ব্যভিচারজাতীয়) কোনো কিছুর প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেনি।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ১৮৫)

নবীজি (সা.)-এর এই শিক্ষণীয় ঘটনা থেকে আমরা পাপ প্রতিরোধের এক অনন্য পদ্ধতি শিখতে পারি। তিনি পাপের জন্য কঠোর ভর্ত্সনা, অপমান বা সামাজিক চাপ প্রয়োগ না করে একজন বিপথগামী যুবকের হৃদয়ে বিবেকের আলো জ্বালিয়ে দেন। যুক্তির মাধ্যমে তার হৃদয়ে উপলব্ধি ঢেলে দেন, যা নিজের মা, বোন, মেয়ে বা আত্মীয়ার জন্য অপছন্দনীয়, তা অন্যের জন্যও সমান অপছন্দনীয়।

আজকের সমাজকে পাপ থেকে বাঁচাতে আমাদেরও এই নববী কৌশল অনুসরণ করা প্রয়োজন। কারণ মানুষকে পরিশুদ্ধ করার সর্বোত্তম পথ হলো তার অন্তরে আল্লাহভীতি ও আত্মসম্মান জাগিয়ে তোলা, বিশেষত যুবসমাজকে তিরস্কার না করে, দূরে ঠেলে না দিয়ে তাদের সঙ্গে বসে কথা বলতে হবে, তাদের মানসিকতা বুঝতে হবে। তরুণদের ভুলকে ঘৃণা করলেও তাদের প্রতি দরদ হারানো যাবে না। সহমর্মিতা, প্রজ্ঞা ও হৃদয়স্পর্শী উপদেশই মানুষকে সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন করে। তাই আমাদেরও উচিত পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে এই দয়া ও প্রজ্ঞার শিক্ষা বাস্তবায়ন করা। তাহলেই গড়ে উঠবে পাপমুক্ত পবিত্র সমাজ।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!