নোবিপ্রবিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ৬৯ জন কর্মচারীর মধ্যে ৫৫ জনই জামায়াত মতাদর্শের

  • আপডেট সময় বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
  • ৫ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) বর্তমানে এক চরম প্রশাসনিক ও নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার অভিযোগ ওঠেছে। বুধবার বেলা ১১ টায় নোয়াখালী প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মলেনে এমন দাবি করছিলেন বিশ^বিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক নেতা।

এ সময় শিক্ষক নেতা ড. শফিকুর রহমান, ড. জাহাঙ্গীর সরকার ও অধ্যাপক আবিদুর রহমান বলেন, আমরা আশা করেছিলাম ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় উপেক্ষা করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সম্পন্ন হবে। এটি ছিল ছাত্র-জনতার বিপ্লবের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।

——————————————————————————————–

সংবাদ সম্মেলন : নোবিপ্রবি প্রশাসনের অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও

দলীয়করণের শ্বেতপত্র প্রকাশ

——————————————————————————————–

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের সেই স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে ধূলিসাৎ করে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) বর্তমান উপাচার্যের নেতৃত্বাধীন বর্তমান প্রশাসন গত ১৭ মাসে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে পুনরায় সেই পুরনো দলীয়করণ ও রাজনৈতিক পরিচয়কেই মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

তাঁরা বলেন, যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে নির্দিষ্ট আদর্শের অনুসারীদের পুনর্বাসনের এই প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক মেরুদন্ড ভেঙে দিচ্ছে। এছাড়াও প্রশাসনের বিরুদ্ধে আর্থিক আত্মসাৎ, লিঙ্গ ও সংখ্যালঘু বৈষম্য, ইউজিসির নীতিমালা লঙ্গনের, প্রাতিষ্ঠানিক স্বেচ্ছাচারিতা ও হয়রানি এবং ব্যক্তিগত সুবিধা ও স্বজনপ্রীতি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠেছে।

——————————————————————————————————-

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা রক্ষার্থে এই অনিয়মগুলো জনসমক্ষে আনা জরুরি বলে তাঁরা মনে করছেন। তাতে ধারাবাকিভাবে বেশ কতগুলো অভিযোগ লিখিতভাবে স্পষ্ট করেন তাঁরা। বলা হয়েছে-

—————————————————————————————————

শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে রাজনৈতিক আধিপত্য ও বৈষম্য : বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে নিয়োগের মূল মানদন্ড হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

রাজনৈতিক একচেটিয়াকরণ : নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের মধ্যে ৩১ জন জামায়াতপন্থী এবং মাত্র ৩ জন বিএনপি ও অন্যান্য মতাদর্শের।

লিঙ্গ ও সংখ্যালঘু বৈষম্য : প্রশাসনে চরম নারীবিদ্বেষী মনোভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে নারী শিক্ষক মাত্র ৩ জন এবং সংখ্যালঘু শিক্ষক সংখ্যা শূন্য। নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাবৃন্দের মধ্যে কোনো নারী কিংবা সংখ্যালঘু নেই। ৬৯ জন কর্মচারীদের মধ্যে নারী কর্মচারী ৩ জন এবং সংখ্যালঘু ৫ জন।

রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগ : ২১ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৯ জনই জামায়াতপন্থী, যার মধ্যে ৭ জন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এরমধ্যে ভিসির পিএস সাবেক শিবির নেতা, ট্রেজারার দপ্তরের সহকারী পরিচালক সাবেক কৃবির শিবির সভাপতি হিসেবে উল্লেখযোগ্য। উল্লেখ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ৬৯ জন কর্মচারীর মধ্যে ৫৫ জনই জামায়াত মতাদর্শের।

নিয়োগপ্রাপ্ত পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রায় ৯ জন শিক্ষকের একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, এই ৯ জনের মধ্যে ২ জন শিক্ষকের কোনো স্কোপাস ইনডেক্সড পাবলিকেশন কিংবা সাইটেশন নেই।

তাঁরা দাবি করছেন, একজন পিএইচডিধারী শিক্ষকের গবেষণার নুন্যতম মানদন্ড ছাড়াই নিয়োগ পাওয়া স্পষ্টত প্রমাণ করে যে, মেধা ও গবেষণার চেয়ে দলীয় পরিচয় ও উপাচার্যের ব্যক্তিগত পছন্দই নিয়োগের মূল চাবিকাঠি। যাতে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মানকে দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আইনি ও নীতিগত লঙ্ঘন : ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অসংখ্য নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।

আইন বিভাগ : নোবিপ্রবি রিজেন্ট বোর্ডের সদস্য কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতপন্থী কোষাধ্যক্ষের আপন ভাই ড. শফিউল্লাহকে নিয়মবহির্ভূতভাবে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দুদক অভিযান চালালেও বর্তমানে রহস্যজনকভাবে কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ : মাত্র একজন প্রার্থী উপস্থিত থাকা সত্বেও লিখিত পরীক্ষা ও বোর্ড সম্পন্ন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

মেধাবীদের বঞ্চনা : ইইই বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম স্থান অধিকারী এবং লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হওয়া নোবিপ্রবিয়ান সাবেক এক নারী শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে জামায়াতপন্থী নেতার ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক ও আর্থিক দুর্নীতি : বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল এবং ক্ষমতার অপব্যবহার এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সম্মানী বণ্টন বৈষম্য : ভর্তি পরীক্ষার সম্মানীতে সাধারণ শিক্ষকরা মাত্র ২৬ হাজার টাকা পেলেও ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার প্রত্যেকে নিয়ম বর্হিভূতভাবে ২ লাখ টাকার ওপরে অর্থ গ্রহণ করেছেন।

কক্ষ সংস্কারে অপচয় : যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণীকক্ষ ও ল্যাব সংকট চরমে। অথচ ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের কক্ষ সংস্কারে ৭৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

————————————————————————————————————-

চেক জালিয়াতি : বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের অর্থ আত্মসাতের এক ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠেছে। বলা হয়েছে, ৫ লাখ ৩১ হাজার টাকার একটি চেক জালিয়াতির অভিযোগে বলা রয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে ইস্যুকৃত একটি চেকে ওই ব্যক্তির কোনো প্রকার স্বাক্ষর বা সম্মতি ছাড়াই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যার নামে চেকটি ইস্যু করা হয়েছিল তাকে কোনো অর্থ না দিয়ে পুরো ৫ লাখ ৩১ হাজার টাকাই প্রশাসনের একটি অসাধু চক্র আত্মসাৎ করেছেন। একজন ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে এবং তার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়ার এই ঘটনা কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং একটি বড় ধরনের দন্ডনীয় অপরাধ।

————————————————————————————————————

বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট জালিয়াতি : বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট সিস্টেম স্থাপনের ক্ষেত্রেও নজিরবিহীন অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এবং আইন বহির্ভূতভাবে চট্টগ্রামের ‘কম্পিউটার ভিলেজ’ কে এই কাজের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক স্বেচ্ছাচারিতা ও হয়রানি : উপাচার্য নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে বিভিন্ন অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করছেন।

প্রশ্নপত্র ও বোর্ড গঠন : বিজ্ঞান ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়া সত্বেও তিনি অ্যাকাউন্টিং, পলিটিক্যাল সায়েন্স, বাংলা, আইনসহ বিভিন্ন বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিজেই প্রণয়ন ও মডারেশন করেছেন। এছাড়া ইউজিসির নীতিমালা লঙ্গন করে নিয়োগ বোর্ডে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি-ট্রেজারারদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

মব কালচার ও শিক্ষকদের হয়রানি : শিবিরের নেতাকর্মীদের দিয়ে ‘মব’ তৈরি করে ভিন্ন মতাদর্শেও শিক্ষকদের ক্যাম্পাসের বাইরে রাখা হয়েছে, যারা বর্তমানে বেতন-ভাতা ছাড়াই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

পদোন্নতি বঞ্চিতকরণ : যোগ্য হওয়া সত্বেও ভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষক, বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘুদের পদোন্নতিতে অযাচিত শর্তারোপ করে হয়রানি করা হচ্ছে।

ব্যক্তিগত সুবিধা ও স্বজনপ্রীতি : উপাচার্য ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক কাজে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ব্যবহার করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বাসায় যাতায়াত করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে থাকা জামায়াত নেতা ও আইন বিভাগের শিক্ষক সাজ্জাদুল করিমের স্ত্রীকে বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে নিয়োগ প্রদান।

——————————————————————————————————

বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দল থেকে ডিগবাজি দিয়ে জামায়াতপন্থী হওয়া ইইই বিভাগের শিক্ষক কামরুজ্জামানের ভাইকে লাইব্রেরি সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে তিনি কৌশলে আওয়ামীপন্থী ইএসডিএম বিভাগের মহিনুজ্জামানসহ কিছু শিক্ষক নেতাকে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্ব ও ডিন পদে বসিয়ে রেখেছেন।

————————————————————————————————–

অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে ‘ক্যামব্রিজ গ্র্যাজুয়েট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে অহংকার প্রদর্শন করেন এবং অন্যান্য অভিজ্ঞ পিএইচডিধারী শিক্ষকদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। উল্লেখ্য, তিনি ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বৃত্তির মাধ্যমে ক্যামব্রিজ থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন বলে জানা যায়। তবে এই বৃত্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জামায়াত,শিবির-সম্পৃক্ততা থাকা বাঞ্ছনীয়-এমন অভিযোগও প্রচলিত রয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে উপাচার্য ড. মুহাম্মদ ইসমাইলকে ফোন দিলেও তিনি রিসিভ না করায় তাঁর মতামত সংযুক্ত করা যায়নি।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!