ফজলে এলাহী খাঁন।। ২ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
—————————————————-
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে আজ সবচেয়ে উদ্বেগজনক সমস্যাগুলোর একটি হলো মানহীন ও অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের বিস্তার। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয় নয় ; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক গভীর হুমকি। ভুল চিকিৎসা, ভুয়া রিপোর্ট, অদক্ষ ও অপ্রশিক্ষিত জনবল, অনিরাপদ চিকিৎসা পরিবেশ, ভুয়া চিকিৎসক এবং ন্যূনতম মানদণ্ড ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার মতো অনিয়ম আজ বহু মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হলেও বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রেই কিছুদিন পর সেগুলো আবার চালু হয়ে যায়। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়: শুধু সিলগালা করে কি এই ভয়াবহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব? স্পষ্টতই না।
এ সমস্যার সমাধানে প্রথমেই প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ, হালনাগাদ ও নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেজ। কোথায় কতগুলো হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক আছে, কোনটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত, কোনটি অনিয়মে চলছে, আর কোনটি সম্পূর্ণ অবৈধ—এসব তথ্য সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। এতে করে প্রশাসনিক নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ অনেক সহজ হবে।
তবে শুধু তালিকা করলেই চলবে না ; দরকার কঠোর, কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা। অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় কেবল দরজায় তালা ঝোলানো নয়, বরং তাদের যন্ত্রপাতি, নথিপত্র, রোগীর রেকর্ড, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ল্যাব সরঞ্জাম, ওষুধ, অপারেশন থিয়েটারের উপকরণ—সবকিছু আইনানুগভাবে জব্দ করতে হবে। কারণ কেবল সিলগালা করলে তারা আবার ফিরে আসে, কিন্তু কার্যক্রম চালানোর মূল উপকরণ জব্দ করা গেলে পুনরায় চালু হওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজন একটি স্ট্যান্ডার্ড জেনেরিক সিজার লিস্ট, যাতে প্রতিটি অভিযানে একই মানদণ্ডে কী কী জব্দ করা হবে তা নির্ধারিত থাকে। একই সঙ্গে অভিযান পরিচালনায় থাকতে হবে একটি সমন্বিত টিম—নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং জব্দকৃত মালামাল পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা।
———————————————————————————————————-
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এ ধরনের অনিয়মকে শুধুই প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখলে হবে না। যখন ভুল চিকিৎসা, ভুয়া রিপোর্ট বা অযোগ্য ব্যক্তির চিকিৎসা কার্যক্রমের কারণে রোগীর জীবনহানি বা গুরুতর ক্ষতি হয়, তখন সেটিকে জনজীবনের জন্য বিপজ্জনক অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
———————————————————————————————————-
এর পাশাপাশি দরকার একটি শক্তিশালী মনিটরিং কাঠামো। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে অবৈধ ও মানহীন বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য আলাদা মনিটরিং উইং গঠন, নিয়মিত ফলোআপ, অভিযোগ যাচাই, লাইসেন্স নবায়নের কঠোর মূল্যায়ন এবং স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহিমূলক সম্পৃক্ততা এখন সময়ের দাবি।
ডিজিটাল নজরদারি ও জনসচেতনতাও এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইনে লাইসেন্স যাচাইয়ের সহজ ব্যবস্থা, বৈধ-অবৈধ প্রতিষ্ঠানের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা, এবং অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা গেলে সাধারণ মানুষও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তবে সব প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে দেখলে হবে না। যেগুলো কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানোন্নয়নের মাধ্যমে নিয়মের মধ্যে আনা সম্ভব, তাদের নির্দিষ্ট সময় দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান প্রতারণা, ভুয়া চিকিৎসা, ভুয়া রিপোর্ট ও গুরুতর অনিয়মের মাধ্যমে মানুষের জীবন নিয়ে খেলছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেয়া চলবে না।
মানুষের জীবন নিয়ে আপসের সুযোগ নেই। সময় এসেছে শুধু সিলগালা নয়, বরং কঠোর, সমন্বিত, আইনসম্মত ও স্থায়ী ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার নামে চলা প্রতারণার এই বিপজ্জনক চক্র ভেঙে দেয়ার।
———————————————————————————————————-
চমৎকার ও সময়োপযোগী এই বিশ্লেষণধর্মী লেখাটির জন্য কৃতিত্ব ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্যারকে। তাঁর সুস্পষ্ট, বাস্তবধর্মী ও দায়িত্বশীল উপস্থাপনাটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটকে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে।
Leave a Reply