মুফতি মাহমুদ হাসান।। ০৭ এপ্রিল, ২০২৬।।
ইসলাম সব বিষয়ে মধ্যপন্থা পছন্দ করে। শরীরের স্বাস্থ্যের বিষয়েও মধ্যপন্থার নির্দেশ দেয়। পরিমিত খাবার, হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীর ঠিক রাখার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ইসলাম অধিক স্থূলতা ও মুটিয়ে যাওয়াকে অপছন্দ করে।
হাদিসের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শরীর মোবারক বেশি চিকনও ছিল না, আবার মোটাও ছিল না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি সুন্দর কাউকে দেখিনি, যেন সূর্য তাঁর ললাটে বিচরণ করছে। আর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে দ্রুতগতির হাঁটা কাউকে দেখিনি, যেন জমিন তার জন্য গুটিয়ে যেত। আমি তাঁর সঙ্গে হেঁটে হাঁফিয়ে যেতাম, অথচ তাঁর কিছুই হতো না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৪৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় স্ত্রী আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে নিজে দুই-দুইবার দৌড় প্রতিযোগিতা দেয়ার ঘটনা তো সবারই জানা। তা ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদেরও পরস্পরে দৌড় প্রতিযোগিতায় লাগাতেন।
শাররিক স্থূলতা অকল্যাণের নিদর্শন
ইমরান ইবনে হুছাইন (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, এরপর যারা তাদের সঙ্গে মিলিত হবে, এরপর যারা এদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আসবে। অতঃপর এমন এক যুগ আসবে, যাদের (বেশির ভাগ) আমানত রক্ষা করবে না, বরং খিয়ানত করবে, আর না দেখে (মিথ্যা) সাক্ষ্য দেবে, মানত পুরা করবে না। আর তাদের মধ্যে স্থূলতা ও মোটা হওয়া প্রকাশ পাবে। (বুখারি, হাদিস : ২৬৫১)
সহিহ বুখারির অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার আল্লামা আইনি (রহ.)-এর ব্যাখ্যায় লেখেন, তখন খাদ্যদ্রব্যের প্রাচুর্য হবে আর তারাও প্রয়োজনের অধিক হরেক রকম খাদ্যাভ্যাসের দরুন মুটিয়ে যাবে। জাদা (রা.) বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) একজন মোটা মানুষ দেখতে পেলেন। তখন তিনি তার ভুঁড়ির দিকে আঙুলে ইশারা করে বললেন, ‘ এটি না থাকলে তোমার জন্য কল্যাণকর হতো। ’ [মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৫৮৬৮, হাদিসটিকে ইমাম হাকেম ও হাফেজ জাহাবি (রহ.) সহিহ বলেছেন]
—————————————————————————————————————-
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, বস্তুত ঈমানদাররা এক ভুঁড়িতে খায়, আর কাফির-মুনাফিকরা সাত ভুঁড়িতে খায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৩৯৪)
—————————————————————————————————————-
সাহাবিদের দৃষ্টিতে শাররিক স্থূলতা
আমিরুল মুমিনিন উমর ফারুক (রা.)-এর কাছে জনৈক মোটা ব্যক্তি এলো, যার শরীর যেন গোস্তের স্তূপ আর সে অধিক স্থূলতার কারণে ‘ আ-হ আ-হ ’ (তথা অস্বাভাবিক আওয়াজ) করছিল। উমর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী ? সে বলল, হে আমিরুল মুমিনিন ! এটা হলো আল্লাহ প্রদত্ত বরকত। উমর (রা.) বলেন, ‘ অসত্য, এটি বরং আল্লাহর আজাব। ’ (আলবিদাউ ওয়ান্নাহইউ আনহা : বর্ণনা নম্বর ২০৩)
তাবেঈ ছাবিত বুনানি (রহ.) বর্ণনা করেন, আয়েশা (রা.)-এর কাছে প্রায় সময় শিশুদের দোয়া নেয়ার উদ্দেশ্যে আনা হতো। একদা একটি মেয়েশিশুকে আনা হলো, যে অস্বাভাবিক মোটা ছিল। তখন তিনি মেয়েটির অভিভাবকদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা তাকে আটা দিয়ে এভাবে ঠেসে ভরেছ কেন ? (আলবিদাউ ওয়ান্নাহইউ আনহা : বর্ণনা নম্বর ১৯৯)
মাকহুল দিমাশকি (রহ.) বর্ণনা করেন, উমর ফারুক (রা.) শামবাসীর কাছে এই নির্দেশনামা লিখে পাঠালেন যে ‘ তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাঁতার, তীরন্দাজি ও ঘোড়দৌড় শেখাও। ’ (ফাজায়েল রমি ফি সাবিলিল্লাহ : বর্ণনা নম্বর ১৫)
অপর একটি বর্ণনায় এসেছে—খলিফা উমর (রা.) মুসলিমদের নির্দেশ দিতেন যেন তারা ঘোড়ায় লাফিয়ে ওঠে। (মুসনাদে আহমাদ : হাদিস নম্বর ৩০১)। এমনকি খলিফা উমর (রা.) নিজেও লাফ দিয়ে ঘোড়ায় ওঠানামা করতেন। (আলমুজামুল কাবির : হাদিস নম্বর ৫৫)।
মুসলিম জাহানের মহান খলিফা হয়েও এমন আচরণ করতে তিনি কোনো অসম্মানবোধ করতেন না।
আজ মুসলিমরা অন্যান্য দ্বিনি বিষয়ের ন্যায় তাদের শরীরচর্চার এই গুরুত্বপূর্ণ সবকও ভুলে গেছে। ফলে তারা একটি অলস ও অকর্মণ্য জাতি হিসেবে বিশ্বে অবহেলিত হচ্ছে।
আল্লাহ তাআলা সব মুসলিমকে দ্বিন-ঈমান, ইলম ও চেতনার সঙ্গে এ বিষয়েও সচেতন করুন ! আমিন !
Leave a Reply