শয়তান কুকর্মের সূক্ষ্ম কারিগর

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৫ পাঠক

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ।। ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

‘ শয়তান ’ এক অদৃশ্য অপশক্তি। আরবি ‘শাতানুন’ থেকে শয়তান শব্দের উৎপত্তি। অর্থ কূপ থেকে পানি ওঠানোর লম্বা দড়ি। কেননা শয়তান ওর কূটকৌশলের মাধ্যমে মানুষকে অন্যায়-অকর্মের দিকে ধাবিত করে, তাই ওকে শয়তান বলা হয়। গ্রিক ভাষায় ওর নাম আজাজিল, যা আরবি ভাষায় হারিস (তাফসিরে কুরতুবি)।

ধূর্ত ও কপট অপশক্তি ‘ শয়তান ’ মানুষকে ধাপে ধাপে বিভ্রান্ত, পাপগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত করে জাহান্নামি বানায়। পবিত্র কোরআনে শয়তানকে ইবলিস নামে ১১ বার উল্লেখসহ প্রায় ৮৮টি স্থানে শয়তান শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। ওর পরিচয় জানিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। ’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৬)।

“ শয়তান জিন জাতির অংশ, ‘ ইবলিস ’ তো জিনদের একজন…। ” (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৫০)।

মানব-দানবের কুপ্রবৃত্তির আড়ালে ঘরবসতি তোলে শয়তান। মন্দ মানবিক চরিত্রের রূপধারণ করে শয়তান ‘ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব ’কে পাপ ও পতনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মহান আল্লাহর সতর্কবাণী, ‘ বলো, আমি আশ্রয় চাচ্ছি…আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ঠ থেকে, যে মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়—মানুষের অন্তরে, জিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকেও। ’ (সুরা : নাস, আয়াত : ১-৬)।

শয়তানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য

১. শয়তান মহান আল্লাহর আদেশ পালনে অস্বীকৃতির মাধ্যমে চির অবাধ্যতাকারী হয়, ২. শয়তান মানুষের পরম ও প্রকাশ্য শত্রু, ৩. ফেরেশতার মর্যাদায় পৌঁছা শয়তান মূলত জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত, ৪. ওর চারটি প্রধান পাখনা রয়েছে, ৫. শয়তানের রয়েছে মানুষরূপী অসংখ্য সহযোগী, ৬. শয়তান মানুষকে বিভ্রান্তি ও পাপের পথে ধাবিত করে।

—————————————————————————————————————-

অভিশপ্ত শয়তান ইসলাম ও মুসলমানের চরম ক্ষতিসাধনের জন্য পৃথিবীর আনাচকানাচে ‘ মানব-দানব ’রূপে সদাতৎপর। আমল বিনষ্টকারী শয়তান অত্যন্ত সুচতুর ও শ্লথগতির বিরামহীন কৌশলে মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। প্রিয় নবী (সা.) সতর্ক করে বলেন, ‘ শয়তান মানবদেহে রক্ত প্রবাহের ন্যায় শিরা-উপশিরায় চলাচল করে…।’ (বুখারি-মুসলিম)।

—————————————————————————————————————-

শয়তান-ওর চেলাপেলা বা কাফির-ফাসিকদের ভয় ঈমানদারদের অন্তরে জাগিয়ে দেয়। মহান আল্লাহর সতর্কবাণী, ‘ শয়তান তোমাদের ওর বন্ধুদের ভয় দেখায়…।’ (সুরা : আল-ইমরান, আয়াত : ১৭৫)।

শয়তান ঈমানদারদের অন্তরে অভাব-দারিদ্র্যের ভয় উদ্রেক করে ‘ ব্যবসায় না হলে, চাকরিটা চলে গেলে তখন কী হবে ? ’ এমন আশঙ্কা দেখিয়ে শয়তান মানুষের মধ্যে মহান আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা (তাওয়াক্কুল)-এর চেতনা হ্রাস করে দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং কার্পণ্যের নির্দেশ দেয়। ’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৬২)।

অত্যাচারী, দুরাচারী, অবৈধ অর্থ-অস্ত্রের অধিকারী ও ক্ষমতাধরদের ভয় ঈমানদারদের অন্তরে জাগিয়ে দেয়া শয়তানেরই কাজ। শয়তান বলে : ‘ সাবধান, এরা খুবই ক্ষমতাধর—এদের অনেক টাকা, এদের অনেক লোকজন, এদের সঙ্গে কী পারা সম্ভব ? ’

বর্ণিত হয়েছে শয়তান—

ছিল আশি হাজার বছর ফেরেশতাদের সঙ্গে, চল্লিশ হাজার বছর জান্নাতের প্রহরী, ত্রিশ বছর ছিল নিকটভাজন ফেরেশতাদের দলনেতা, করেছিল চৌদ্দ হাজার বছর আরশ প্রদক্ষিণ,

১ম আকাশে ওর নাম ছিল—আবেদ, ২য় আকাশে—জাহেদ, ৩য় আকাশে—আরেফ, ৪র্থ আকাশে—ওলি, ৫ম আকাশে—তক্বি, ৬ষ্ঠ আকাশে—খাজিন, ৭ম আকাশে—আজাজিল।

পবিত্র কোরআন-হাদিসে শয়তানের অপকৌশল ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং তা থেকে বাঁচার পথও দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই—

‘ঈমান,ইলম,ইখলাস,

এই তিন শক্তি হলো শয়তান প্রতিরোধের সুসমন্বিত অস্ত্র, যা শাণিত হয় ‘ জিকরুল্লাহ ’ বা মহান আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে। ফলে মহান আল্লাহর দেয়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঈমানদাররা থাকেন সুরক্ষিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ যদি শয়তানের প্ররোচনা তোমাদের প্ররোচিত করে তা হলে আল্লাহর শরণাপন্ন হও…।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ২০০)

শয়তানের অপকৌশল, অপতৎপরতা, মোহনীয় প্রলোভন, বিভ্রান্তি, বিতর্ক, বিভেদ-বিভক্তির অনাচার থেকে সতর্ক থাকা মুমিন বান্দার সব সময়ের কর্তব্য।

শয়তানের অপকৌশল

(ক) মানুষকে শিরক ও কুফরে লিপ্ত করা, (খ) বিদআতে (ধর্মীয় নতুনত্বে) জড়িয়ে দেয়া, (গ) কবিরা গুনাহে আকৃষ্ট করা, (ঘ) ন্যূনতম হলেও ছগিরা গুনাহে উদ্বুদ্ধ করা, (ঙ) ‘মুবাহ’ তথা করলে সওয়াব নেই, না করলে গুনাহ নেই এমন কাজে ব্যস্ত রাখা এবং প্রয়োজনীয় জরুরি ইবাদতকে গৌণভাবে দেখানো, (চ) ফরজ ছেড়ে সুন্নত নিয়ে ব্যস্ত রাখা এবং অধিক পুণ্যময় আমলের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতায় মানুষকে ক্লান্ত করা। [ইবনু কাইয়্যুম জাওজিয়াহ (রহ.)]

পরিশেষে পবিত্র কোরআনের ভাষায় মোনাজাত, ‘ হে আমার প্রতিপালক ! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। ’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ৯৭)

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ,
কাপাসিয়া, গাজীপুর।।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!