গাভীর ম্যাস্টাইটিসে নতুন জুনোটিক জীবাণু শনাক্ত

  • আপডেট সময় শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬
  • ০ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ২৩ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

বাংলাদেশের দুগ্ধ খামার শিল্পে বহুল পরিচিত রোগ গাভীর ম্যাস্টাইটিস। ওলানে প্রদাহজনিত এ রোগে প্রতি বছর ক্ষতির মুখে পড়েন অসংখ্য খামারি।

তবে সম্প্রতি এ রোগ নিয়ে নতুন এক উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এনেছেন ড. মো. বাহানুর রহমান। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের এ অধ্যাপকের নেতৃত্বে একদল গবেষক ম্যাস্টাইটিস আক্রান্ত গাভীর দেহে নতুন এক ধরনের জুনোটিক জীবাণু শনাক্ত করেছেন ; যা কেবল প্রাণীই নয়, মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
———————————————————————————————-
বাকৃবির গবেষণায় মিলল জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন সতর্কবার্তা
———————————————————————————————-
গাভীর ম্যাস্টাইটিস মূলত ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। গ্রামাঞ্চলে এটি ওলান ফোলা, ওলান পাকা বা ওলানে প্রদাহ নামেও পরিচিত। এ রোগে আক্রান্ত গাভীর দুধ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। শুধু তা-ই নয়, দুধের গুণগতমানও নষ্ট হয়ে পড়ে, যা খামারিদের আর্থিক ক্ষতির অন্যতম কারণ। তীব্র সংক্রমণের ক্ষেত্রে গাভীর ওলান স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ফলে অনেক সময় দুধ উৎপাদনের সক্ষমতাই হারিয়ে যায়। নতুন জুনোটিক জীবাণুর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
————————————————————————————————————-

ম্যাস্টাইটিস নিয়ে গবেষণাটি শুরু হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে, যা চলে টানা সাড়ে তিন বছর। এতে সহযোগী গবেষক হিসেবে কাজ করেন ড. মো. হাবিবুর রহমান। বাকৃবির গবেষকরা বিভিন্ন খামার থেকে সংগৃহীত নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, ম্যাস্টাইটিস আক্রান্ত গাভীর শরীরে এন্টারোব্যাক্টর ক্লোয়াসি জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে।

————————————————————————————————————-

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এটি একটি জুনোটিক জীবাণু, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে। আক্রান্ত গাভীর সংস্পর্শে এলে দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষম ব্যক্তির শরীরে দেখা দিতে পারে নিউমোনিয়া, রেচনতন্ত্রের সংক্রমণ এবং সেপটিসেমিয়ার মতো জটিল রোগ। খামারি, দুগ্ধ সংগ্রাহক, পশু চিকিৎসক ও খামারে কর্মরত ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু হওয়ায় চিকিৎসা প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে ওঠতে পারে। এ কারণে গবেষকরা এখনই সতর্কতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করছেন।

জীবাণুটির উৎপত্তি ও সংক্রমণ সম্পর্কে অধ্যাপক ড. বাহানুর রহমান বলেন, এ জীবাণুটি সাধারণত গোয়ালঘরের মেঝে ও নোংরা অংশে পাওয়া যায়। গাভীর ওলান যখন এ মেঝের সংস্পর্শে আসে তখন সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে দুধ দহনের পর ওলানের সঠিক যত্ন নিলে এবং গোয়ালঘর জীবাণুনাশক দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে সহজেই এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি গাভীর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি এড়াতে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

ম্যাস্টাইটিস প্রতিরোধে গবেষক দল এরই মধ্যে ‘বাউ পলিভ্যালেন্ট’ নামে একটি ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছে বলে জানান অধ্যাপক ড. বাহানুর রহমান। ম্যাস্টাইটিস প্রতিরোধে ভ্যাকসিনটি প্রায় ৮০ শতাংশ কার্যকর উল্লেখ করে তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও সরকারি তত্ত্বাবধানে ব্যাপক উৎপাদন শুরু হলে এটি সুলভ মূল্যে খামারিদের কাছে পৌঁছে দেয়া যাবে।

————————————————————————————————————-

ভ্যাকসিন প্রয়োগের পদ্ধতি সম্পর্কে ড. বাহানুর রহমান জানান, গাভীর বাচ্চা প্রসবের প্রায় ছয় মাস আগে প্রথম ডোজ দিতে হয় এবং প্রসবের দেড় মাসের মধ্যে প্রয়োগ করতে হয় দ্বিতীয় ডোজ। এতে গাভীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং ম্যাস্টাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় শতভাগ কমে আসে।

————————————————————————————————————-

গবেষণার পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি (বাস), ইনসেপ্টা ভ্যাকসিন ডিভিশন এবং বাকৃবির মধ্যে একটি চুক্তি হতে যাচ্ছে। তাদের আর্থিক সহায়তা পেলে এর কার্যকারিতা আরো বিস্তৃতভাবে যাচাই করে খামারিদের কাছে উন্নতমানের ভ্যাকসিন পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!