যে কারণে হুমকির মুখে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার

  • আপডেট সময় সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

দেশের খাল-বিল ও পুকুরে উৎপাদিত দেশি প্রজাতির বিভিন্ন মাছ দেশের বাজারে প্রায় নিখোঁজ। যদিও কালেভদ্রে কিছু চোখে পড়ে তা শুধু দেখাতেই সার। কিনতে যেন মুরুদ লাগে।

প্রচলিত প্রবাদ- আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। কিন্তু এখন কি আর এ কথাটি জোর দিয়ে বলা যায় ? এর কারণ অনেক। তবে আমাদের সম্মিলিত হেয়ালিপনা আমাদের এ পর্যন্ত টেনে নিয়ে এসেছে। কোথায় হারিয়ে গেছে আমাদের শোল, গজার, ভেটকি, পাবদা, টাকি, বউমাছ, তাপসি, গুলশা, কাচকি, খৈশা, কৈ, চিতল, বোয়াল, টেংরা, আইড়, বাইন, পুঁটি, শিং, পলি, মাগুর এসব। আমাদের এসব দেশি মাছ সংরক্ষণ জরুরি।

এখন এসব দেশি মাছ বিদেশে রপ্তানি হয়। এসব মাছের মধ্যে রয়েছে পাবদা, গুলশা, শিং, ট্যাংরা, শোল ইত্যাদি। রপ্তানি হয় ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, জাপান, কানাডা, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ভারত, নেপাল প্রভৃতি দেশে।

———————————————————————————————————————————–

ভরা মৌসুমে দেশের পুকুর ও খালে-বিলে প্রচুর দেশি মাছ উৎপাদিত হয়। পোনা ছাড়ার পর চার মাসের মধ্যে তা রপ্তানির উপযোগী হয়ে ওঠে। উৎপাদনের প্রায় সবই রপ্তানি হয়। দেশের খামারি এবং চাষিরা পুকুর ও খালে-বিলে বাণিজ্যিকভাবে দেশি মাছের চাষ করছেন। পাশাপাশি মাছের পোনা উৎপাদনে ওঠেছে প্রচুর হ্যাচারি। সেগুলোতে চাষের তালিকায় যোগ হয় শিং, ট্যাংরা, কই, পাবদা, গুলশাসহ নানা প্রজাতির মাছ। এসব মাছের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রপ্তানিকারকেরা খাল-বিল-পুকুর ও আড়ত থেকেই কিনে নেন। বাকি মাছ স্থানীয় বাজারগুলোর পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়।

———————————————————————————————————————————–

তা ছাড়া এ দেশের নদী-নালা, খাল-বিল-হাওর ও সমুদ্রে যে পরিমাণ মাছ উৎপন্ন হয় তার মধ্যে অনেকখানি নষ্ট হয়ে যায় পরিবহন সংরক্ষণের অভাবে। মাছ ধরার পর শতকরা ৩০ ভাগ মাছ ক্রেতার হাতে পৌঁছার আগেই পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। দেশি মাছ সংরক্ষণে আমাদের বেশকিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। সেগুলো হলো- মৎস্য আইন মেনে চলা, কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধ করা, জেলে পরিবারের আর্থ-সামাজিক নিশ্চয়তা, দেশব্যাপী মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা, পুরোনো জলাশয়গুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারসাধন, ছোট মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় সংরক্ষণ, প্লাবনভূমির বেহাত হওয়া রোধ করা, দেশি পোনা উৎপাদন ও প্লাবন ভূমিতে মজুতকরণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ছোট মাছ চাষ ও সংরক্ষণ এবং জাটকা মাছ সংরক্ষণ।

———————————————————————————————————————————–

দেশি মাছ সংরক্ষণে করণীয় বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে সবার আগে আমাদের ভাবতে হবে প্রাকৃতিক জলাশয়, প্লাবনভূমি, জাটকা মাছ সংরক্ষণ এবং মৎস্য পরিবেশবান্ধব নীতি ও অবকাঠামো সম্পর্কে। কারণ বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মোট ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মধ্যে ১২টি চরম বিপন্ন এবং ১৪টি সংকটাপন্ন। যদিও আমাদের আছে চিংড়িসহ ২৯৬টি মিঠাপানির মাছ এবং ৫১১টি সামুদ্রিক মাছ। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করলে মাছের যে প্রাকৃতিক জলাশয়, মুক্ত জলাশয় এবং প্লাবনভূমি রয়েছে তা আমাদের অযাচিত ও অনৈতিক ব্যবহারের কারণে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তারকে হুমকির সম্মুখীন করেছে।

———————————————————————————————————————————–

মাছ ধরার ক্ষেত্রে কখনোই বিষ বা অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করব না করে দেশি মাছ সংরক্ষণ ও চাষের মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক চেহারাটাই পাল্টে দেয়া সম্ভব। সেজন্য প্রয়োজন মৎস্যবান্ধব পরিবেশনীতি ও অবকাঠামোর সফল বাস্তবায়ন।

দেশি মাছগুলোতে আছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো খনিজ উপাদান এবং ভিটামিন। তা ছাড়া দেশি মাছের আছে অন্ধত্ব, রক্তশূন্যতা, গলগ- প্রতিরোধ ক্ষমতা। বিশেষ করে গর্ভবতী মা ও শিশুদের ছোট ছোট মাছ খাওয়া ভীষণ প্রয়োজন। দেশি মাছের এসব পুষ্টিগুণ আমিষের নিরাপত্তা গড়ে তুলতে অতুলনীয়। এ কারণেই দেশি মাছ সংরক্ষণ ও বেশি করে চাষ করা প্রয়োজন।

দেশি মাছগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের আওতায় আনতে হবে। বদ্ধ জলাশয়ে দেশি প্রজাতির মাছ যাতে বেশি পাওয়া যায় সেজন্য বেশকিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে। সেগুলো হলো ধান ক্ষেতে ছোট প্রজাতির মাছ চাষের ব্যবস্থা করা এবং এ ধরনের মাছ সারা বছর পাওয়ার জন্য ধানক্ষেতে মিনি পুকুর তৈরি ; মাছের প্রজনন মৌসুমে মাছ না ধরা, ফাঁস জাল ব্যবহার না করা, রাক্ষুসে মাছ কমানোর জন্য বিষ প্রয়োগ না করা, রুই জাতীয় মাছের সাথে ছোট প্রজাতির মাছের মিশ্র চাষ, জলাশয় প্লাবনভূমি এবং পুকুরে দেশি মাছের চাষাবাদের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

দেশি মাছ চাষে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা উচিত।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!