দিশারী ডেস্ক। ১৭ মে, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
যক্ষ্মা বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের যে ৩০টি দেশে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বেশি, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ২০২৪ সালে দেশের ৩০ লক্ষাধিক লোকের পরীক্ষা করে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬২৪ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছে।
২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নির্মূলের জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ফলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমে আসছে। তবে এখনো আক্রান্ত ১৭-১৮ শতাংশ মানুষ শনাক্তের বাইরে রয়েছেন।
রাজধানীর শ্যামলী এলাকার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ‘ ২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নির্মূলের জন্য আমরা সারা দেশে কাজ করে যাচ্ছি। এখন দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা যাচ্ছে। এ জন্য বেশি শনাক্ত হচ্ছে। মৃত্যুর হার অনেক কমেছে।
২০১৫ সাল থেকে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। তার পরও ১৭-১৮ শতাংশ মানুষ এখনো শনাক্তের বাইরে। তারা টেস্ট করতে আসেন না। বিভিন্ন কারণে বা অনীহায় তারা পরীক্ষা করান না। লক্ষ্য অর্জনে তাদেরও পরীক্ষা করে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যক্ষ্মা প্রতিরোধযোগ্য এবং নিরাময়যোগ্য রোগ। যে কারও যেকোনো রোগ হতে পারে, সেটা লুকিয়ে রাখার কিছু নেই।’
—————————————————————————————————–
চিকিৎসকরা বলছেন, যক্ষ্মা নির্মূলে এখন বড় দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একটি হচ্ছে যে ১৭-১৮ শতাংশ শনাক্তের বাইরে রয়েছেন, তাদের দ্বারা অন্যদের মাঝে ছড়াচ্ছে। আরেকটি হচ্ছে সুপ্ত যক্ষ্মা। যদিও সুপ্ত থাকা অবস্থায় এর মাধ্যমে রোগটি ছড়ায় না। অনেক বছর শরীরে লুকিয়ে থাকে। সহজে শনাক্ত হয় না। বড় কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। অন্য কোনো রোগে চিকিৎসকের কাছে গেলে তখন তারা প্রয়োজন বুঝে পরীক্ষা করালে সুপ্ত যক্ষ্মা ধরা পড়ে।
—————————————————————————————————–
ডা. আয়শা আক্তার বলেন, সক্রিয় যক্ষ্মা ফুসফুস আক্রান্ত করে। আর সুপ্ত যক্ষ্মা দেহের অন্য যেকোনো অঙ্গ আক্রান্ত করতে পারে। সক্রিয় যক্ষ্মার ক্ষেত্রে এক নাগাড়ে তিন সপ্তাহের বেশি কাশি থাকে, ওজন কমে যাওয়া, কাশির সঙ্গে রক্ত পড়া, খাবারে অরুচি দেখা দেয়। অন্য অঙ্গের যক্ষ্মার বেলায় শুরুতে খুব একটা লক্ষণ প্রকাশ পায় না। সামান্য কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। যেমন : কোনো একটা জায়গা ফুলে যেতে পারে, টিউমারের মতো ছোট লাম্প হতে পারে, যেটি অনেক দিন ভালো হচ্ছে না, আবার সার্জারির পরও যক্ষ্মা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওজন কমে যায়, রাতে জ্বর আসে এবং খাবারে অরুচি হয়। বোন টিউমারও হতে পারে। এ ছাড়া ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মাও আছে। বছরে একবার ফুল বডি চেকআপ করালে এটা ধরা পড়ে। তবে ৮৫ শতাংশই সক্রিয় যক্ষ্মা।
যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানা ধরনের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে রোগ শনাক্তকরণ ও ওষুধ সরবরাহ এবং দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। নানামুখী উদ্যোগের কারণে শনাক্ত বেশি হওয়ায় মৃত্যুর হার কমে এসেছে।
২০১৫ সালে দেশে ২ লাখ ৯ হাজার ৪৩৮ জন, ২০১৬ সালে ২ লাখ ২৩ হাজার ৯২১ জন, ২০১৭ সালে ২ লাখ ৪৪ হাজার ২০১ জন, ২০১৮ সালে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৫৯৬ জন, ২০১৯ সালে ২ লাখ ৯২ হাজার ৯৪২ জন, ২০২০ সালে ২ লাখ ৩০ হাজার ৮১ জন, ২০২১ সালে ৩ লাখ ৬ হাজার ৭০১ জন, ২০২২ সালে ২ লাখ ৬১ হাজার ৯৫৭ জন, ২০২৩ সালে ৩ লাখ ১ হাজার ৫৬৪ জন এবং ২০২৪ সালে ৩ লাখ ১৩ হাজার ৬২৪ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়।
২০১০ সালে দেশে যক্ষ্মা রোগে আনুমানিক মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ৫৪ জন, যা ২০২৩ সালে কমে প্রতি লাখে ২৬ জনে এসে দাঁড়িয়েছে। ২০১৫ সালে প্রতি লাখে ৪২ জন, ২০১৬ সালে ৩৯ জন, ২০১৭ সালে ৩৪ জন, ২০১৮ সালে ২৯ জন, ২০১৯ সালে ২৪ জন, ২০২০ সালে ২৬ জন, ২০২১ সালে ২৫ জন, ২০২২ সালে ২৫ জন এবং ২০২৩ সালে ২৬ জন যক্ষ্মায় মারা যান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, টেকনাফ, উখিয়া ও ভাসানচর এলাকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৫০ জন রোহিঙ্গার যক্ষ্মা রোগ শনাক্ত করা হয়।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকা বিভাগে; ৮৫ হাজার ৬০৮ জন। তারপর যথাক্রমে চট্টগ্রামে ৬০ হাজার ৩০৯ জন, রাজশাহীতে ৩৫ হাজার ৮১৯ জন, রংপুরে ৩৪ হাজার ৮৩৩ জন, খুলনায় ৩৪ হাজার ১৪ জন, বরিশালে ১৯ হাজার ৬০০ জন, সিলেটে ২২ হাজার ২২ জন এবং ময়মনসিংহে ২১ হাজার ৪১৯ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, যক্ষ্মা ও ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের জন্য সারা দেশে উন্নত ও অত্যাধুনিক মানের ৮৪০টি জিন এক্সপার্ট, ১৫০টি ট্রুন্যাট, ১ হাজার ৪২টি মাইক্রোস্কোপ এবং ২৭৭টি ডিজিটাল এক্স-রে সরবরাহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ও পাঁচটি রিজিওনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরির মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগ শনাক্ত করা হয়।জিন এক্সপার্ট ও ট্রুন্যাটের ব্যবহার পরিধি বৃদ্ধির কারণে ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭৯৯ জন ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ৪৪টি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, সাতটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং এনজিও ক্লিনিকে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
শিশু যক্ষ্মা রোগীদের শনাক্তকরণ বাড়াতে দেশে ২০২৩ সাল থেকে স্টুলের জিন এক্সপার্ট চালু করা হয়। যার ফলে ২৪ সালে মোট শনাক্তকৃত রোগীর ৫ দশমিক ২ শতাংশ ছিল শিশু যক্ষ্মা রোগী, যা কি না ২৩ সালের তুলনায় বেশি। ওই বছর ৪ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুর যক্ষ্মা শনাক্ত করা হয়।
উল্লেখ্য, ১৮৮২ সালের ২৪ মার্চ রবার্ট কচ যক্ষ্মা রোগের জীবাণু আবিষ্কার করেন। যক্ষ্মা রোগের জীবাণু অবিষ্কারের দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে এবং চিকিৎসা সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ১০০ বছর পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হচ্ছে।
Leave a Reply