নিউমোনিয়ায় মৃতের ৫২% নবজাতক

  • আপডেট সময় বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৯ পাঠক

দিশারী ডেস্ক।। ১২ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।

বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৪ লাখ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মারা যায় ২৪ হাজার। অর্থাৎ দিনে মারা যায় প্রায় ৬৬ শিশু। নিউমোনিয়ায় বাংলাদেশে নবজাতক পর্যায়ে মৃত্যুহার ৫২ শতাংশ।

বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়। তথ্য অনুসারে, দেশে গত পাঁচ বছরে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় একই রয়ে গেছে। ২০১৭ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুর হার ছিল ৮ শতাংশ। সর্বশেষ জরিপ ২০২২ সালেও ৭.৪ শতাংশ।

দেশের শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টি, অপরিণত শিশুর জন্ম, বায়ুদূষণ, অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকরতা এবং রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা ঠিক সময়ে শনাক্ত করতে না পারায় নিউমোনিয়ায় মৃত্যু কমছে না।

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) তথ্য বলছে, শৈশবকালীন মৃত্যুর ১৩ শতাংশ হয় নিউমোনিয়ার কারণে। বাংলাদেশে নবজাতক পর্যায়ে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর হার ৫২ শতাংশ, এক মাস থেকে এক বছরের মধ্যে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর হার ৩২ শতাংশ। বাকি ১৬ শতাংশ মৃত্যু হয় এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে।

নিউমোনিয়া কী, কারা বেশি ঝুঁকিতে

নিউমোনিয়া হলো ফুসফুসের এক ধরনের সংক্রমণ, এতে এক বা উভয় ফুসফুসের বায়ুথলি স্ফীত হয়ে যায়। ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়ার কারণ।

ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসের রক্তনালিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে ফুসফুসের অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়, রক্তে অক্সিজেনস্বল্পতা দেখা দেয়।

যেকোনো বয়সের মানুষের নিউমোনিয়া হতে পারে। তবে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি। পাঁচ বছরের কম বয়সীর ঝুঁকি বেশি, তার চেয়ে বেশি ঝুঁকি এক বছরের কম বয়সী শিশুর, তার চেয়ে বেশি ঝুঁকি নবজাতকের।

আইসিডিডিআরবির আরেক গবেষণা বলছে, নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশ মারা যাচ্ছে বাড়িতে, কোনো চিকিৎসা না পেয়ে। বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েও মারা যাচ্ছে ৩ শতাংশ, আর হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েও মারা যাচ্ছে ৪৫ শতাংশ শিশু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, শিশু চিকিৎসায় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১০টি মৌলিক সুবিধা থাকা উচিত। তবে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সুবিধা জরিপ ২০১৭ অনুযায়ী, দেশে মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এই সুবিধাগুলো রয়েছে। বাকি ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রেই নেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, ওষুধ বা প্রশিক্ষিত কর্মী।

দেশে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ কোন জীবাণুর মাধ্যমে হচ্ছে, তার ৫০ শতাংশ কারণ এখনো অজানা। চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সমীর কুমার সাহা বলেন, সংক্রমণ ভাইরাসের মাধ্যমে না ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে, তা জানার উদ্যোগ নেই। নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সংক্রমণের কারণ জানা জরুরি।

————————————————————————————————-

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে শিশুদের নিউমোনিয়ার হার ২০২০ সাল পর্যন্ত কমে ২০২৫ সালে এসে বাড়ছে। বাংলাদেশে নবজাতক শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। কিন্তু বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশের নিজস্ব তথ্য-উপাত্তের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে এই উদ্যোগ বন্ধ। জাতীয় জরিপগুলো হচ্ছে। বিদেশ থেকে ফান্ড আসুক না আসুক, সরকারের উচিত নিজেদের অর্থ দিয়ে জরিপ কার্যক্রম চালিয়ে চাওয়া।

তিনি বলেন, নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে শিশুর রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। যেটাকে চিকিৎসকের ভাষায় হাইপ্রোক্সিমিয়া বলে। তীব্র নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত প্রতি তিনটি শিশুর একটি হাইপ্রোক্সিমিয়ায় ভুগে থাকে। কিন্তু যেসব হাসপাতাল চিকিৎসা দেয়, তারা বলতে পারে না শিশুটির হাইপ্রোক্সিমিয়া আছে কি নেই। এ ছাড়া নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়া প্রতি পাঁচটি শিশুর একটি মারা যায় রেফারেল জটিলতায়।

————————————————————————————————-

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আল আমিন মৃধা বলেন, সব সর্দি-কাশিই নিউমোনিয়া নয়। যখন জ্বর এবং এর সঙ্গে কফ ও শ্বাসকষ্ট থাকে, তখন শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ হয়েছে বলে ধরা হয়। দুই মাসের নিচের শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের হার মিনিটে ৬০ বারের বেশি, এক বছরের নিচে ৫০ বা এর বেশি এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সের শিশুর ৪০ বার বা এর বেশি হলে তাকে শ্বাসকষ্ট বলে। তাই জ্বর-কাশিতে আক্রান্ত শিশু এ রকম ঘন ঘন শ্বাস নিলে বা শ্বাসের সঙ্গে বুক বা পাঁজর নিচে দেবে যেতে থাকলে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, ‘শিশুর শ্বাসকষ্ট বেশি হলে খাবারের পর সবকিছু বমি করে দিলে, খিঁচুনি হলে বা অজ্ঞান হলেও দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। দুই বছরের নিচে শিশুকে এ সময় বুকের দুধ দেওয়া বন্ধ করা যাবে না।’

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসের হেলপ লাইন ডিরেক্টর শামসুল হক। ডা. হক বলেন, সরকার এরই মধ্যে নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুর হার কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন, নিউমোনিয়ার টিকা ইপিআই টিকার সঙ্গে দেয়া হচ্ছে। ‘ হেল্পিং বেবি’স ব্রেথ ’ নামে একটি কর্মসূচি আছে, যাতে শিশু জন্মের এক মিনিটের মধ্যে তার শ্বাস নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করা হয়। মায়ের দুধ শিশুর জন্য সবচেয়ে পুষ্টিকর এবং সঠিক খাবার। এ বিষয়েও মায়েদের সচেতন করা হয়।

—————————————————————————————————-

সরকারের এত উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও নিউমোনিয়ায় শিশু মৃত্যুহার না কমার বিষয়ে জানতে চাইলে ‘ সেভ দ্য চিলড্রেন, বাংলাদেশ ’-এর সিনিয়র অ্যাডভাইজার (স্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ডা. গোলাম মোতাব্বির তাঁর মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দুটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছেন বলে জানান। এক. রোগী চিকিৎসা দেরিতে শুরু করেন। সামান্য সর্দি-কাশিকে গুরুত্ব দেন না। হয়তো এর ডেঞ্জার সাইনগুলো জানতেন, কিন্তু ওই সময় ভুলে গেছেন। যখন সমস্যা ক্রিটিক্যাল হয়, তখন গুরুত্ব দেন। দুই. এর সঠিক চিকিৎসা বেছে নিতে ভুল করা। শুরুতে অনেকে তেল মালিশ, কবিরাজি বা ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ নিয়ে চিকিৎসা করেন। এর যে ভালো ওষুধ, চিকিৎসা ও সেবা হাসপাতালগুলোতে রয়েছে, সেখানে তাঁরা সময় মতো যান না।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!