মুফতি সাইফুল ইসলাম।। ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
খাদ্য শুধু পেট ভরানোর উপকরণ নয় ; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য ও সভ্যতার সঙ্গেও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কারণ মানুষ যে খাদ্য গ্রহণ করে, সেটিই তার রক্তে প্রবাহিত হয়, চরিত্রে প্রভাব ফেলে, ইবাদতের শক্তি জোগায়। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আধুনিক সভ্যতার চরম উৎকর্ষের মাঝেও খাদ্যে ভেজাল আজ এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অধিক লাভের লোভে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে।
আর ভেজাল মেশানো খাদ্য প্রতিদিন নিঃশব্দে হত্যা করছে অসংখ্য মানুষকে। অথচ খাদ্য ও পণ্যের বিশুদ্ধতা রক্ষায় ইসলামের অবস্থান খুবই কঠোর, স্পষ্ট ও আপসহীন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) খাদ্যশস্যের একটি স্তূপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি স্তূপের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন।
ফলে তাঁর আঙুলগুলো ভিজে গেল। তিনি বলেন, ‘ হে স্তূপের মালিক, এ কী ব্যাপার ? ’ লোকটি বলল, ‘ হে আল্লাহর রাসুল, এতে বৃষ্টির পানি লেগেছে। ’ তিনি বললেন, ‘ তুমি ভেজা অংশ ওপরে রাখলে না কেন, যাতে লোকেরা তা দেখতে পারত ? ’ অতঃপর তিনি ঘোষণা করলেন, ‘ যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি করে, আমার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০২)। এই হাদিস ইসলামী অর্থনীতি ও সামাজিক নৈতিকতার একটি মৌলিক দলিল।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, মহানবী (সা.) নিজ হাতে খাদ্য পরীক্ষা করেছেন। তিনি কেবল নসিহত করেননি; বরং সরাসরি তদন্ত করেছেন। এটি প্রমাণ করে, বাজার তদারকি ও ভেজাল প্রতিরোধে ইসলামে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্বের বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘ এই হাদিসে প্রতারণা, ভেজাল ও পণ্য গোপন দোষের কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত হয়। এটি হারাম এবং বড় গুনাহ। ’ (শরহু সহিহ মুসলিম)।
মহানবী (সা.)-এর ঘোষণা ‘ আমার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই ’ এটি অত্যন্ত ভয়ংকর সতর্কবাণী। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ধোঁকাবাজ ব্যক্তি নববী আদর্শ ও সুন্নাহ থেকে বিচ্ছিন্ন। সে কিছুতেই উম্মতে মুহাম্মাদির অংশ হতে পারে না।
কোরআনের দৃষ্টিতে খাদ্যে ভেজাল ও প্রতারণা
পবিত্র কোরআনে ওজনে কম দেয়া ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে, ‘ ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। ’ (সুরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত : ১)
পবিত্র কোরআনে আরো বলা হয়েছে, ‘ মাপ ও ওজন ইনসাফের সঙ্গে পূর্ণ করো। ’ (সুরা আল-আনআম, আয়াত : ১৫২)। ইবন কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘ যে ব্যক্তি ক্রয়-বিক্রয়ে ধোঁকাবাজি করে, সে আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত হয়।’ (তাফসির ইবন কাসির)। প্রতারণার কঠোর নিন্দায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ মুসলিম মুসলিমের ভাই ; সে তার ওপর জুলুম করবে না, তাকে ধোঁকা দেবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৪)।
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘ সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯)। এতে বোঝা যায়, ব্যবসায় সততা কেবল সামাজিক গুণ নয় ; বরং আখিরাতের উচ্চ মর্যাদার মাধ্যম।
মুসলিম স্কলারদের দৃষ্টিতে খাদ্যে ভেজাল
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেন, ‘ যে খাদ্য হারাম বা ধোঁকায় উপার্জিত, তা দোয়া কবুলের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।’ (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন)। ইবন তাইমিয়া (রহ.) আরো স্পষ্ট করে বলেন, ‘ বাজারে ভেজাল ও প্রতারণা রোধ করা শাসকের অন্যতম ফরজ দায়িত্ব।’ (আল-হিসবা ফিল ইসলাম)। অর্থাৎ খাদ্যে ভেজাল শুধু ব্যক্তিগত গুনাহ নয়; এটি একটি সামাজিক অপরাধ, যার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপও ইসলামে বৈধ ও প্রয়োজনীয়।
খাদ্যে ভেজাল একটি নৈতিক অপরাধ ও সামাজিক বিশ্বাসঘাতকতা। যা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক গুনাহ।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক।।
Leave a Reply