দিশারী ডেস্ক।। ০৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দলের সিনিয়র নেতাদের বড় একটি অংশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে বিএনপি মাঠের রাজনীতি কতটুকু সুসংগঠিত রাখতে পারবে এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে বিশিষ্টজনদের চাওয়া, বিএনপির দলীয় রাজনীতি যেন সরকারে হারিয়ে না যায়।
বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, মাঠের রাজনীতি তো অবশ্যই থাকতে হবে। না থাকলে দলের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়বেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলে নেতৃত্ব তৈরি হবে না। ফলে অচিরেই বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশনায় সংগঠনের দিকে মনোযোগী হবেন দায়িত্বশীল নেতাকর্মীরা—এমন আশাবাদই ব্যক্ত করেছেন দলের অনেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতি ও সরকার একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তাদের ভূমিকা এক নয়। রাজনীতি মূলত মতাদর্শ, দলীয় অবস্থান ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। আর সরকার হলো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামো। এই দুইয়ের সীমারেখা স্পষ্ট না হলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হয়।
সরকার ও রাজনীতি একাকার হয়ে গেলে ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। নিকট-অতীতে এমন উদাহরণ রয়েছে।
এবার নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। বিএনপির তুলনায় বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী। ফলে প্রত্যাশা থাকবে বিএনপির রাজনীতি বা দল যেন সরকারে হারিয়ে না যায়।
সরকারের মূল কাজ হলো জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। দলীয় স্বার্থ যদি রাষ্ট্রের স্বার্থের ওপর প্রাধান্য পায়, তাহলে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গণতন্ত্রে রাজনীতি অপরিহার্য, তবে তা যেন সরকারের কার্যক্রমকে অযথা প্রভাবিত না করে। একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষ প্রশাসন। নীতিনির্ধারণে রাজনীতি দিকনির্দেশনা দেবে ; কিন্তু সরকার পরিচালনায় পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই হবে প্রকৃত গণতন্ত্রের পরিচয়।
————————————————————————————————————
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক বলেন, এটা মানতে হবে, প্রায় ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামল এবং দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন সবেমাত্র শেষ হলো। নির্বাচিত নতুন সরকার গঠন করা হয়েছে। আসলে এখনো ওইভাবে মেজার করা যাবে না যে দল হিসেবে বিএনপি সরকারের ভেতরে ঢুকে গেছে, নাকি সরকার দলের ভেতরে ঢুকে গেছে। এখন বিএনপিতে যেটা হচ্ছে, তারা রূপান্তরের সময় পার করছে। যেহেতু তারা নতুন সরকার গঠন করেছে, বিভিন্ন জায়গায় তাদের যে সেটআপগুলো, সেগুলো তারা পুনর্গঠন করছে অথবা রাষ্ট্র পুনর্গঠন বলতে পারেন।
———————————————————————————————————–
তিনি বলেন, আমাদের দেশে আসলে যখন কোনো দল সরকারে যায়, সরকার ও দলের ভেতর খুব একটা তফাত পাওয়া যায় না। অতীতে বাংলাদেশে কখনো এটি হয়নি যে অর্ধেক মানুষ দল করবে আর বাকি অর্ধেক মানুষ সরকারে যাবে। এটার মূল কারণটা হচ্ছে আমরা সবাই ক্ষমতার ভাগ চাই। সবাই আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই। সবাই আমরা ক্ষমতার স্বাদ চাই। এখন যেটা হয়েছে, দলের অধিকাংশ লোক সরকারে যেতে চাচ্ছে। দলের সিনিয়রদের অলমোস্ট সরকারে ঢুকে গেছে।
তিনি আরো বলেন, মাঠের রাজনীতিতে বিএনপির শক্ত কোনো প্রতিপক্ষ এখনো তৈরি হয়নি। বিএনপি দীর্ঘদিন (১৯৯৮ সাল থেকে) জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছে। সরকারেও ছিল। অল্প কিছুদিন হলো বিএনপির অপজিশন হলো জামায়াত। তবে এখনো জামায়াত স্ট্রংলি দাঁড়াতে পারছে না। এর জন্য আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। নির্বাচনের রেশ এখনো কাটেনি। একটা-দুইটা সংসদ অধিবেশন হোক, তারপর দেখা যবে। ঈদের পর হয়তো আস্তে আস্তে বিরোধিতা শুরু হবে। দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে বিরোধিতা হোক। তবে সম্প্রীতির রাজনীতি যাতে হয়। যেন এমনটা না হয়, মুখ দেখাদেখি বন্ধ। রাজনীতিতে অচিরেই সুস্থ দ্বারা ফিরে আসা উচিত। বর্তমানে যে স্বস্তির ধারা, সেটি চলমান থাকবে বলে আশা করি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা আশা করি, একটি প্রাণবন্ত সংসদ হবে। জামায়াতে ইসলামী আছে, তরুণদের একটি দল আছে, তারা সংসদে ভূমিকা রাখবে। রাজনীতিতে এর প্রভাব থাকবে। আমাদের দলের তরুণ নেতৃত্ব যাঁরা আছেন, তাঁরা মাঠে সক্রিয় রাজনীতি করবেন। তিনি বলেন, সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হতে একটু সময় লাগবে। সংসদ অধিবেশন শুরু হলে আস্তে আস্তে সব সক্রিয় হয়ে যাবে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, দল দলের মতো চলছে। সরকার চলবে সরকারের মতো। দলকে কিন্তু ইগনোর করা যাবে না। সমন্বয় করে চলতে হবে। একটাকে বাদ দিয়ে আরেককটা নয়। দল ও সরকার দুটোকেই আমাদের গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, সাংগঠনিক রাজনীতি না থাকলে নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়বে। এ ছাড়া পাঁচ বছর পর আমাদের আবার ভোট চাইতে জনগণের কাছে যেতে হবে। কারণ জনগণের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি আছে।
যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক সাঈদ ইকবাল মাহমুদ টিটু বলেন, দল কখনো সরকারে হারাবে না। বিএনপি জনগণের প্রত্যাশা ধারণ করে রাজনীতি করে। আশা করি, জনগণের প্রত্যাশা ধারণ করে উন্নয়নমুখী সরকার পরিচালিত হবে। দল-সরকার সব পক্ষই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করে যাবে ইনশআল্লাহ।
ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, অচিরেই নতুন ধারার রাজনীতি শুরু হবে। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকনির্দেশনায় নতুন ধারার সেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে।
Leave a Reply