অন্যের কাজ নিজের নামে প্রচার করা মুনাফেকি ও প্রতারণা

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২২ পাঠক

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ।। ০৭ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

পৃথিবীর সবকিছুতেই এখন করপোরেট কালচার শুরু হয়েছে। অনেকে বলেন, রাজনীতিও নাকি করপোরেট কাঠামোতে বন্দি হয়ে পড়েছে। চাকরি-বাকরিতেও আছে এই কালচার। এর একটি দিক হলো, কাজ না করে প্রশংসা কুড়িয়ে নেয়া, অন্যের ক্রেডিট ছিনতাই করা কিংবা কখনো সামষ্টিক অর্জনকে ব্যক্তিগত অর্জন মনে করা এবং তা প্রচার-প্রসার করা।

এ ধরনের কাজের মূল উদ্দেশ্য থাকে বৈষয়িক উন্নতি, অর্থবিত্ত, সাময়িক সুনাম অর্জন ও পদ-পদবি বাগিয়ে নেয়া। এর পথ ধরে উচ্ছিষ্টভোগী চাটুকার, সুবিধাবাদী, ধূর্ত মোসাহেব, মুনাফিক শ্রেণির উদ্ভব হয়। ‘ কাজ অন্যের, বাহবা আমার ’—এমন দ্বিচারী মনোভাবের লোক এখন করপোরেট জগতে ভরপুর। অথচ এমন ঘৃণ্য চরিত্র একই সঙ্গে মুনাফেকি, মিথ্যা, প্রতারণা ও জুলুম।

মুনাফিকরা যা করেনি, তার প্রশংসা পেতে চায় : আল্লাহ বলেন, ‘ যেসব লোক তাদের কৃতকর্মে খুশি হয় এবং তারা যা করেনি এমন কাজে প্রশংসা পেতে চায়, তুমি ভেবো না যে তারা শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে। আসলে তাদের জন্য আছে মর্মান্তিক আজাব। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৮)

————————————————————————————————————–

আলোচ্য আয়াতে এমন লোকদের জন্য কঠোর শাস্তির কথা ঘোষিত হয়েছে, যারা শুধু তাদের বাস্তব কৃতিত্ব নিয়েই খুশি নয়, বরং তারা চায় যে তাদের খাতায় এমন কৃতিত্বও লেখা হোক, যা তারা করেনি। এই রোগ যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে ছিল, বর্তমানেও পদাভিলাষী ও যশান্বেষী প্রকৃতির মানুষের অভাব নেই। চালাকি ও চাতুর্যের মাধ্যমে নেতৃত্ব লাভকারী নেতাদের মধ্যেও ব্যাপক হারে এ রোগ পাওয়া যায়।

আলোচ্য আয়াতের শানে নুজুল হিসেবে একাধিক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে কিছু মুনাফিক তাঁর সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়া থেকে পিছপা হতো। এতে তারা নিজেদের মধ্যে আনন্দবোধ করত। তারপর যখন রাসুল ফিরে আসতেন, তখন তার কাছে ওজর পেশ করত এবং অন্যভাবে নিজেদের প্রশংসা শুনতে চাইত। তখন আল্লাহ তাআলা এ আয়াত নাজিল করেন। (বুখারি, হাদিস : ৪৫৬৭)

————————————————————————————————————–

অন্য বর্ণনায় এসেছে, মারওয়ান ইবনে হাকাম তাঁর দারোয়ানকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের কাছে পাঠিয়ে বললেন, যদি কোনো লোক কোনো কাজ না করেও প্রশংসা পেতে ভালোবাসার কারণে শাস্তিযোগ্য হয়, তাহলে আমরা সবাই তো শাস্তি পাব। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, তোমার আর এ আয়াতের মধ্যে কি সম্পর্ক ?

এ আয়াতের ঘটনা হলো রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদি আলেমদের কোনো ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার কারণে তারা সঠিক জবাব গোপন করে ভিন্ন জবাব দিয়ে রাসুলের প্রশংসা পাওয়ার চেষ্টা করল। এ প্রসঙ্গে আয়াতটি নাজিল হয়। (বুখারি, হাদিস : ৪৫৬৮)

অন্যের কাজ নিজের নামে প্রচার করা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত : মিথ্যা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ইসলামের চোখে গর্হিত অপরাধ। কোনো বিষয়ে নিশ্চিত জানাশোনা না থাকা সত্ত্বেও সে বিষয়ে অনুমানভিত্তিক কোনো কথা বলা অন্যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ যে বিষয়ে তোমার পরিপূর্ণ জ্ঞান নেই সে বিষয়ের পেছনে পোড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এসবের ব্যাপারে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসিত হবে। ’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)

কথা আর কাজ এক না হওয়া আল্লাহর অপছন্দ : মহান আল্লাহ বলেন, ‘ হে ঈমানদাররা, তোমরা তা কেন বলো, যা তোমরা করো না ?’ (সুরা : সফ, আয়াত : ২)

এখানে সম্বোধন যদিও ব্যাপক, তবু প্রকৃত পক্ষে সেই মুমিনদেরই লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, যাঁরা বলাবলি করছিলেন যে আমরা যদি আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় কাজ কি জানতে পারি, তাহলে আমরা তা করব। কিন্তু যখন তাদের সেই প্রিয় কাজটা বলে দেয়া হলো, তখন তারা অলস হয়ে গেল। তাই তাদের ধমক দেওয়া হচ্ছে যে কল্যাণকর যেসব কথা বলো, তা করো না কেন ? যে কথা মুখে বলো, তা কাজে করো না কেন ? যা জবান দিয়ে বলো, তা রক্ষা করো না কেন ?

মিথ্যুক আল্লাহর অভিশাপপ্রাপ্ত : মিথ্যাবাদী আল্লাহর অভিশাপের মধ্যে থাকে। যেকোনো সময় তার ওপর আসমানি আজাব আসতে পারে। মুবাহালাসংক্রান্ত আয়াতে এসেছে, ‘ অতঃপর আমরা সবাই (আল্লাহর কাছে) এ মর্মে প্রার্থনা করি যে মিথ্যুকদের ওপর আল্লাহর লানত পতিত হোক। ’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৬১)

কৃতিত্ব ছিনিয়ে নেওয়া সুস্পষ্ট প্রতারণা : যাদের চরিত্রে আছে মুনাফিকি, তারা ধূর্ত প্রতারক ও ধোঁকাবাজ ধরনের হয়। এরা আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে প্রতারণা করে। তারা মনে করছে, এতে তারা সফলকাম ও বিজয়ী হচ্ছে, অথচ প্রকারান্তরে তারাই প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত হচ্ছে।

পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘ আল্লাহ ও ঈমানদারদের তারা ধোঁকা দিতে চায়, আসলে তারা অন্য কাউকে ধোঁকা দিচ্ছে না, বরং নিজেদেরই প্রতারিত করছে, অথচ তাদের সে অনুভূতি নেই। ’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৯)

অন্যের অবদান স্বীকার না করা সংকীর্ণমনার পরিচয় : কিছু মানুষ নিজের মতাদর্শকেই সব সময় সত্যের একমাত্র মানদণ্ড মনে করে। নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এতে মানসিক যন্ত্রণা নিজেই ভোগ করে।

এই সংকীর্ণতার ফলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অন্য মুসলিম ভাইদের সহযোগী না ভেবে প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করে। তারা নিজেদের পন্থাকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে মনে করে। অনেকে নিজ দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং সত্য জানার পরও শুধু দলীয় স্বার্থে ভুলকে সমর্থন করে। এই সংকীর্ণতা ইখলাসের পরিপন্থী এক মারাত্মক ব্যাধি, যা মুসলিম উম্মাহর দেহে বিভেদ ও ঘৃণার বিষ ছড়িয়ে দেয়।

অন্যের প্রাপ্য সম্মান না দেয়া জুলুম : কারো প্রতি জুলুম করা, অত্যাচার করা—এসব খারাপ কাজ, অন্যায়; এটা আমরা সবাই জানি। আমরা এই জুলুমকে নির্ধারিত কয়েকটি অর্থেই বুঝি। অথচ সমাজে প্রচলিত এমন অনেক জুলুম আছে, যেগুলোকে আমরা জুলুমই মনে করি না বা একেবারে মামুলি বিষয় মনে করি। অন্যের প্রাপ্য সম্মান না দেয়াও জুলুম।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন : ‘ যারা জুলুম করে, তাদের দিকে তোমরা ঝুঁকো না; নতুবা তোমাদের আগুন স্পর্শ করবে। ’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ১১৩)

প্রত্যেক মানুষকে পদমর্যাদা অনুযায়ী সম্মান করতে হবে, এটাই ইসলামের বিধান। বয়স অনুপাতে মানুষের প্রতি পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা পোষণ করা উচিত। এই মর্মে হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ যে ব্যক্তি ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের প্রতি সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। ’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৩৫৬)

মহানবী (সা.) আরো বলেন, ‘ মুসলিম বয়োবৃদ্ধকে সম্মান করা আল্লাহকে সম্মান করার নামান্তর…।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৪৩)

মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!