ভারতে ৮০ লাখ পুরুষকে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ !

  • আপডেট সময় বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০২৫
  • ৯৫ পাঠক

দিশারী ডেস্ক ২৬ জুন,২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।

১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত, ভারতের প্রায় ৮০ লাখ পুরুষকে জোর করে বন্ধ্যাকরণ করা হয়। শুধু ১৯৭৬ সালেই ৬০ লাখ পুরুষকে বাধ্য করা হয় অস্ত্রোপচারে। এই সময়ে ব্যর্থ অস্ত্রোপচারে মৃত্যু হয় প্রায় ২ হাজার মানুষের। উত্তাওয়ার মতো মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলো ছিল সরকারের বিশেষ লক্ষ্য।

———————————————-

একটি গ্রামের স্মৃতিতে বিভীষিকা

————————————————

১৯৭৬ সালের নভেম্বরের ঠান্ডা রাত। হরিয়ানার মেওয়াট অঞ্চলের উত্তাওয়ার গ্রামটি তখন পুলিশে ঘেরা। অধিকাংশ মানুষ পালাচ্ছিল—কেউ জঙ্গলে, কেউবা পাশের গ্রামে, কেউ বা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কূপে। কিন্তু মোহাম্মদ দিনু ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি পালালেন না।

তিন নাতির সঙ্গে উত্তাওয়ার গ্রামের মোহাম্মদ দিনু | ছবি- আল জাজিরা

তখন ভারতে জারি ছিল জরুরি অবস্থা। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একচ্ছত্র শাসনের চলছে ১৭তম মাস। নাগরিক অধিকার স্থগিত, বিরোধী নেতারা বিনা বিচারে আটক, গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ, আর তারই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় শুরু হয়েছিল এক ভয়াবহ কর্মসূচি—জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ।

দিনু ও তার ১৪ বন্ধু সেই অভিযানের শিকার। পুলিশের গাড়িতে তূলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় এক শিবিরে। দিনুর ভাষায়—‘এই আত্মত্যাগে আমরা আমাদের গ্রাম ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করেছি।‘ আজ প্রায় ৯০ বছর বয়সী দিনু বলেন, ‘ গ্রাম রক্ষা করতে আমরা নিজেদের সঁপে দিয়েছিলাম। দেখুন চারপাশে, এখনো ঈশ্বরের সন্তানদের কোলাহলে মুখর এই গ্রাম।‘

———————————————————————————————————————————–

১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত, ভারতের প্রায় ৮০ লাখ পুরুষকে জোর করে বন্ধ্যাকরণ করা হয়। শুধু ১৯৭৬ সালেই ৬০ লাখ পুরুষকে বাধ্য করা হয় অস্ত্রোপচারে। এই সময়ে ব্যর্থ অস্ত্রোপচারে মৃত্যু হয় প্রায় ২ হাজার মানুষের। উত্তাওয়ার মতো মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলো ছিল সরকারের বিশেষ লক্ষ্য। স্থানীয়দের ধারণা, মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্মহার বেশি হওয়ায় তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল।

———————————————————————————————————————————–

দিনুর বাড়ির পাশেই তখন ১৩ বছরের মোহাম্মদ নূর ঘুমাচ্ছিলেন বাবার কোল ঘেঁষে। হঠাৎ ঘোড়ায় চড়া পুলিশ এসে বাড়ির দরজা ভেঙে দেয়। ‘ চার দিন কেউ রান্না করতে পারেনি,’ বলেন নূর। তাকে থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করে ছেড়ে দেয়া হয়। কারণ তখন তার বয়স ১৫ বছরের কম।

গ্রামটির তৎকালীন প্রধান আব্দুর রহমান প্রশাসনের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার কথিত উক্তি—‘ আমি কুকুরও দেব না, আর আপনারা মানুষ চাইছেন !’ স্থানীয়রা আজও তাকে স্মরণ করে। তবে প্রশাসন থামেনি। গ্রামের অনেক পুরুষ পালিয়েও সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাড়ি ফেরেনি। সমাজে কলঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে—উত্তাওয়ারের পুরুষদের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে যায়, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। অনেকে মানসিক আঘাত সামলে উঠতে পারেননি।

———————————————————————————————————————————–

ভারতে আজ আর জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নেই। প্রজনন হার কমে এসেছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জরুরি অবস্থার সময়ের সেই দমনমূলক সংস্কৃতি আবার ফিরে এসেছে এক ভিন্ন রূপে, দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শাসনে।

———————————————————————————————————————————–

ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানী শিব বিশ্বনাথন বলেন, ‘ জরুরি অবস্থাই ভারতীয় কর্তৃত্ববাদের ভিত্তি তৈরি করেছে। ইন্দিরা গান্ধী থেকে নরেন্দ্র মোদী—সবাই এক দমনমূলক শাসন তৈরি করেছেন। বাইরে থেকে গণতন্ত্রের মুখোশ পরা।‘

দিনুকে আট দিন আটকে রেখে পাঠানো হয় পলওয়ালের বন্ধ্যাকরণ শিবিরে। বাড়ি ফিরে পান একমাত্র সন্তান ও পুত্রকে। এখন তার বেরশ কয়েকজন নাতি-নাতনিও আছে।

২০২৪ সালে দিনুর স্ত্রী সালিমা মারা যান। দিনু বলেন, ‘সাত প্রজন্ম দেখেছি আমি! এমন কজনকে দেখেছেন ? ’ এক হাতে ঠান্ডা পানীয়তে চুমুক দিয়ে দিনু বলেন, ‘ আমরাই এই গ্রাম বাঁচিয়েছি। না হলে ইন্দিরা তো আগুন লাগিয়েই দিতেন।‘

আল জাজিরা অবলম্বনে

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!