দিশারী ডেস্ক।। ০৩ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।।
প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক দুধরনের চাপে বাংলাদেশের কৃষি খাত ক্রমেই সংকটে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনিয়মিত আবহাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, যন্ত্রায়নের ধীরগতি এবং একক ফসল নির্ভরতার জটিলতা মিলিয়ে উৎপাদন ক্ষমতা কমছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে দেশের কৃষি খাত।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) সতর্ক করেছে, ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের ধান উৎপাদন প্রায় ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনারে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে এমন চিত্র ওঠে এসেছে। সেমিনারে বিআইডিএসের মহাপরিচালক প্রফেসর একে এনামুল হকের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আখতার। অনুষ্ঠানে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস।
————————————————————-
বিআইডিএসের প্রতিবেদন
————————————————————-
গবেষণায় উঠে এসেছে ঘন ঘন তাপপ্রবাহের কারণে কৃষি শ্রমঘণ্টা কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। ফলে জমি প্রস্তুত করতে বেশি সময় লাগে, উৎপাদন কমেছে এবং শ্রমমজুরিও বাড়ছে দ্রুত। এর দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি, বাজার লেনদেন থেকে শুরু করে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বর্ষার অপ্রত্যাশিত আচরণ প্রধান খাদ্যশস্য—ধান, গম, ভুট্টার জীবনচক্রকে প্রভাবিত করছে। বন্যা, খরা এবং ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘন আঘাত কৃষির অস্থিরতাকে আরও বাড়াচ্ছে।
বিআইডিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ ক্ষুদ্র কৃষক এখনো পুরোপুরি যন্ত্রায়িত কৃষিতে যেতে পারেননি। উচ্চমূল্য, তথ্যের অভাব ও প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে মাঠপর্যায়ে উৎপাদন বাড়ানো কাঙ্ক্ষিত গতিতে হচ্ছে না। দেশের ৮০ শতাংশ কৃষিজমি এখনো ধাননির্ভর একক ফসলে আটকে আছে। কোনো মৌসুম ব্যর্থ হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায়।
গবেষণা বলছে, বোরো ধানের উৎপাদন কয়েক বছর ধরে স্থবির। নতুন হাইব্রিড জাত, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং লবণ-সহনশীল জাত দ্রুত প্রবর্তন না হলে আগামীতে গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম ঝুঁকির মুখে পড়বে। অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট করছে এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেট ও ফসফেট বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু-সংক্রান্ত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের কৃষি ব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে এখনই বহুমাত্রিক পদক্ষেপ নিতে হবে। ফসল বৈচিত্র্য, আধুনিক যন্ত্রপাতি, পানি ব্যবস্থাপনা, গবেষণানির্ভর নতুন জাত ও টেকসই কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া ২০৫০ সালের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিআইডিএসের মহাপরিচালক এনামুল হক বলেন, কৃষিতে মূল্য সংযোজন ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে বিভিন্ন ফসলের সম্মিলিত অবদানকে শক্তিশালী করেছে। তবে ধানের মতো সরকার নিয়ন্ত্রিত বাজারে লাভ সীমিত। সেখানে দারিদ্র্য কমার প্রভাব তুলনামূলক কম। শ্রমশক্তি বেশি হলেও কৃষকের লাভ সীমিত থাকায় তারা এখন বেশি ঝুঁকছে চুক্তিভিত্তিক চাষে। এদিকে ইউরিয়া সার ব্যবহারে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে।
পরিকল্পনা সচিব শাকিল আখতার বলেন, দেশের কৃষি তথ্যব্যবস্থা সঠিক সমন্বয়ে নেই। বিআইডিএস এবং খামারবাড়ির তথ্য এক নয়, যা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ফসল উৎপাদনের নির্ভরযোগ্যতাকে প্রভাবিত করছে। অনেক কৃষি প্রকল্প অযথা ব্যয়বৃদ্ধি এবং ধাপে ধাপে এগোয় না।
Leave a Reply