উৎসবের ভেতর ইবাদতের পথ

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৩ পাঠক

মুফতি সাইফুল ইসলাম।। ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।

মানুষের জীবনে উৎসব বা আনন্দ আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু মুমিনের জীবনে একটি বিষয় কখনো থেমে থাকে না; তা হলো আল্লাহর স্মরণ। কারণ ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা কেবল দুঃখের মুহূর্তে নয়, বরং উৎসব বা আনন্দের সময়েও মানুষকে তার রবের সঙ্গে যুক্ত রাখে। সেটি পহেলা বৈশাখ হোক বা জীবনের অন্য কোনো উৎসবমুখর দিন।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ অতঃপর যখন তোমরা তোমাদের (হজের) কাজ সম্পন্ন করবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করো, যেমন তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ করতে অথবা তার চেয়েও অধিকভাবে। ’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ২০০)

———————————————————————

আনন্দের দিনেও আল্লাহকে স্মরণ

——————————————————————–

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট হজ-পরবর্তী সময় হলেও এর শিক্ষা সর্বজনীন। মানুষ যখন কোনো বড় কাজ বা আনন্দঘন মুহূর্ত অতিক্রম করে, তখন তার উচিত আল্লাহকে আরও বেশি করে স্মরণ করা। কারণ আনন্দের সময় মানুষ সাধারণত নিজেকে ভুলে যায়। কিন্তু কোরআন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ‘ তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব ; আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না। ’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত : ১৫২)

এখানে ‘শোকর’ বা কৃতজ্ঞতা কেবল মুখের কথা নয় ; বরং তা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনচর্চা। নতুন বছরের সূচনা, নতুন অর্জন বা নতুন কোনো উপলক্ষ ; সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়ামত। আর নিয়ামতের সঠিক ব্যবহারই হলো প্রকৃত শোকর।

রাসূলুল্লাহ (সা.) আনন্দের সময়েও আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হননি। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘ রাসূলুল্লাহ (সা.) সব অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করতেন। ’ (মুসলিম, হাদীস : ৩৭৩)

এই হাদীসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখায়, ইসলামে যিকির কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ইবাদত নয় ; বরং এটি একটি অবিরাম সচেতনতা, যা মানুষের অন্তরকে জীবিত রাখে।

তবে ইসলাম আনন্দকে অস্বীকার করে না। বরং তা সুশৃঙ্খল ও পবিত্র আনন্দকে স্বীকৃতি দেয়। আনাস ইবন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, মদিনায় আগমনের পর রাসূলুল্লাহ (সা.) দেখলেন, লোকেরা দুটি দিনে আনন্দ-উৎসব করে। তিনি বললেন, ‘ আল্লাহ তোমাদের জন্য ঐ দুই দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন নির্ধারণ করেছেন—ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। ’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১১৩৪)

এখানে শিক্ষা হলো ; আনন্দ থাকবে, কিন্তু তা হবে আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে, শালীনতা ও সংযমের সঙ্গে। কারণ সীমালঙ্ঘন করলে আনন্দ আর ইবাদত থাকে না ; বরং তা গুনাহে রূপ নেয়।

আজকের অনেক উৎসবই ভোগবাদ, অপচয় ও অশালীনতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। অথচ ইসলাম শেখায় ; আনন্দ হবে পরিচ্ছন্ন, সংযত এবং দায়িত্বশীল।

একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ; আনন্দের সময় মানুষ আল্লাহকে ভুলে গেলে সেই আনন্দই তার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ বলেন, ‘ অবশেষে যখন তারা উপদেশ ভুলে গেল, তখন আমি তাদের জন্য সবকিছুর দরজা খুলে দিলাম ; এমনকি যখন তারা তাদের প্রাপ্তিতে উল্লসিত হলো, তখন হঠাৎ করে আমি তাদের পাকড়াও করলাম। ’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত :৪৪)

এই আয়াত আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে ; প্রতিটি আনন্দই পরীক্ষা। আমরা কি সেই আনন্দে আল্লাহকে স্মরণ করছি, নাকি ভুলে যাচ্ছি?

পহেলা বৈশাখ বা নতুন বছরের শুরু হতে পারে এক নতুন আত্মজাগরণের উপলক্ষ। এদিন আমরা যদি কিছু সহজ আমল দিয়ে নিজেদের শুরু করি ; যেমন ইস্তিগফার, দোয়া, সাদাকা, আত্মসমালোচনা। তাহলে আমাদের আনন্দ ইবাদতে পরিণত হতে পারে।

হাসান আল-বাসরী (রহ.) বলেন, ‘মুমিন ব্যক্তি নিজের আত্মার হিসাব নেয় ; আর কিয়ামতের দিন হিসাব সহজ হবে তাদের জন্য, যারা দুনিয়ায় নিজেদের হিসাব নিয়েছে।’ (ইমাম আহমদ, আয-যুহদ, পৃ. ১২০)

আসলে, আনন্দের দিনই সবচেয়ে বড় পরীক্ষার দিন। দুঃখের সময় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আল্লাহকে ডাকে, কিন্তু আনন্দের সময় তাকে স্মরণ করাই প্রকৃত তাকওয়ার পরিচয়।

তাই নতুন বছরের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক; আমরা আনন্দ করব, কিন্তু সীমার মধ্যে ; উদযাপন করব, কিন্তু গাফিল হব না; জীবনকে উপভোগ করব, কিন্তু ভুলব না। কারণ আমাদের প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি নতুন সূচনা ; সবই আল্লাহর দান। আর যে হৃদয় আনন্দের মাঝেও আল্লাহকে স্মরণ করে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত অর্থে জীবিত।

মহান আল্লাহ আমাদের সকল ইসলামি মূল্যবোধ ধারন করে উৎসবের উনন্দ উদযাপন করার তওফিক দান করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন

এ বিভাগের আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!