দিশারী ডেস্ক।। ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।।
লক্ষীপুরের রামগতি উপজেলার চরবাদাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ ওঠেছে। ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে এসে সাধারণ মানুষকে দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে হয়-এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাপ্রার্থী।
তাদের দাবি, নির্ধারিত সরকারি ফি ও নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে ফাইল নড়াচড়া করেন না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাই বাধ্য হয়ে চড়াদামে দালাল ধরতে হয় সেবাপ্রার্থীদের। দালালের মাধ্যমে দরদাম করে টাকা বুঝিয়ে দিলেই তাড়াতাড়ি কাজ হয় যায়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চরবাদাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে প্রায় এক ডজন ব্যক্তি নিয়মিত দালালি করেন। ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, নামজারি, খারিজ, খতিয়ান, দাখিলা, জমির বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহসহ নানা কাজে এসব ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয় বলে অভিযোগ তাদের।
মঙ্গলমবার (২২ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। অফিসের বাইরে প্রচুর লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে এক ডজনের মত শুধু দালাল রয়েছে। অফিসের ভেতরে এমরান হোসেন নামে এক অফিস সহায়ক এসব দালালদের থেকে কাগজপত্র ও টাকা পয়সা বুঝিয়ে নিচ্ছেন। কর্মকর্তা মোবারক হোসেনের রুম তালাবদ্ধ।

তিনি উপস্থিত না থাকার কারণ জানতে চাইলে দুইজন দালাল বলেন, তিনি মন চাইলে আসেন, মন না চাইলে আসেন না। তবে বাসায় বসে কাজ করেন। মাঝেমধ্যে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে দু’চার ঘন্টা ডিউটি করে খরচসহ কাগজপত্র নিয়ে বাসায় চলে যান। এরই মধ্যে দীন-মোহাম্মদ, দুলাল, সুলতান ও মোহাম্মদুল্লাহসহ কয়েকজন দালাল সাংবাদিক আসছে খবর পেয়ে ছিটকে পড়েন।
জানা যায়, উপজেলার চরবাদাম ও চরপোড়াগাছা দুই ইউনিয়ন একটি মাত্র ভুমি অফিস। এ দুই ইউনিয়নে প্রচুর পরিমাণ সরকারের খাস জমি রয়েছে। ওই জমিকে ঘিরে ভুমি অফিস বাণিজ্যে মেতে ওঠে। খাসজমির দখল বুঝিয়ে দেয়া ও রশিদ কাটার নামে বেপরোয়া বাণিজ্য চলছে এ অফিসে। ভুমি উন্নয়ন কর পরিশোধের জন্য সেবা প্রার্থীরা আসলে তাদের ২০-৩০ বছরের বকেয়ার হিসাব দেয়া হয়। পরে তাদের সাথে দরদাম (চুক্তি) করা হয়। চুক্তি মোতাবেক টাকা নিয়ে ২-৫ হাজার টাকার একটি খাজনার দাখিলা ধরিয়ে দেয়া হয়। এমন অভিযোগ করেন চরবাদাম ইউনিয়নের কারামতিয়া এলাকার আবদুর রশিদ।
তিনি বলেন, তার সাড়ে চার একর জমির ১৮ বছরের বকেয়া হিসেবে ৫৫ হাজার টাকার খাজনা আসে। একপর্যায়ে, ২৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ টাকা নিয়ে তহসিলদার তাকে ৫ হাজার টাকার একটি খাজনার দাখিলা ধরিয়ে দেয়। হারুন বাজার এলাকার জহিরুল হক বলেন, জমা খারিজের সরকার নির্ধারিত ফি ১১৭০ টাকা হলেও তিনি দালালের মাধ্যমে ১২ হাজার টাকা দিয়ে জমা খারিজ সম্পন্ন করেন।
এছাড়া জমিজমা বিরোধ নিয়ে আদালতের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দু’পক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে প্রতিবেদন দেয়ার অভিযোগ করেন ২ জন মামলার বাদি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী মামলার বাদি জানান, একটি মামলার তদন্ত রিপোর্ট দিতে তহশিলদারকে তিনি ২০ হাজার টাকা দিয়ে তারপে প্রতিবেদন নেন। আরেক ভুক্তভোগী জানান, তিনি চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে না পারায় রিপোর্ট তার বিরুদ্ধে দেন তহশিলদার মোবারক।
ভুক্তভোগী কয়েকজনের ভাষ্য, সরাসরি ভূমি অফিসে গিয়ে সেবা নিতে গেলে দীর্ঘ সময় অপক্ষা করতে হয়। অথচ পরিচিত দালালের মাধ্যমে গেলে দ্রুত কাজ হওয়ার আশ্বাস মেলে। এ কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হন বলে অভিযোগ করেন।
ভূমি অফিসে দালাল নির্ভরতার অন্যতম কারণ হিসেবে স্থানীয় ভূমি-প্রক্রিয়া, সাধারণ মানুষের ভূমি আইন সম্পর্কে সীমিত ধারণা এবং অফিসে তথ্যপ্রাপ্তির অসুবিধার কথা বলছেন। ফলে একটি শ্রেণি সাধারণ মানুষের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মধ্যস্থাকারী হিসেবে কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে এসব অনৈতিক কাজে লিপ্ত হচ্ছে।
সেবা প্রার্থী মো. মাহফুজুর রহমান ও ইব্রাহীম বলেন, যখনই অফিসে আসি, তখন শুনি কর্মকর্তা নেই। অফিস সহায়ক এমরান অফিসটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে। সকালে খালি পকেটে এসে বিকেলে পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। দেখার যেন কেউ নেই ! আমরা কার কাছে গেলে বিচার পাবো ?
আরেক সেবাপ্রার্থী ইয়াছিন বলেন, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজসে দালাল নিয়োগ করা হয়েছে। তারা দালালদের কাজ আগে করে দেয়। এজন্য মানুষ দালাল ধরে। তিনিও ১১৭০ টাকার একটি জমাখারিজ ১০ হাজার টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে সম্পন্ন করেন।
আবু সালমান বলেন, এ অফিসটিতে সেবাপ্রার্থীদের ব্যাপক হয়রানি করা হয়। ২০০ টাকার কাজ ২০০০ হাজার টাকা দিয়েও সময়মত পাওয়া যাচ্ছেনা। আমি একটি খতিয়ানের জন্য ৩ বার এসে ফিরে যাচ্ছি। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে হয়রানি করে।
এসব অভিযোগ স্বীকার করে অফিস সহায়ক এমরান হোসেন বলেন, আগে দালাল আরও বেশী ছিল। এখন তো অনেক কম। অতিরিক্ত টাকা নেয়ার বিষয় তিনি বলেন, টুকটাক কিছু না নিলে আমরা চলবো কীভাবে ?
দালালদের দৌরাত্ম্য ও ঘুষের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চরবাদাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা মো. মোবারক হোসেন বলেন, আগের তুলনায় দালাল এখন অল্প কয়টা আছে। সব তাড়িয়ে দেবো। কাজ করে দিলে মানুষ খুশি হয়ে আমাদেরকে কিছু দেয়।
Leave a Reply